সিফিলিনাম (Syphilinum) – ডা: হাসান মির্জা

সিফিলিস (উপদংশ) ঃ সিফিলিনামকে জানতে হলে তার গোড়ার কথাটি অগ্রে জানা চাই। দূষিত সহবাসের কারণে সিফিলিটিক মায়াজম প্রথম প্রকাশ পায় জননযন্ত্রে। প্রথমে একটি ক্ষুদ্র ক্ষতের সৃষ্টি করে। এই ক্ষত আজীবন স্বস্থানে থেকে যেতে পারে এবং কোন রকম ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে না। যতদিন না তা সোরাবীজের সঙ্গে মিলিত হয়। জীবণীশক্তি যতক্ষণ সক্রিয় থাকে, কার্যক্ষম থাকে ততক্ষণ সোরাবিষ সুপ্ত অবস্থায় থাকে এবং সুযোগ সুবিধার অভাবে কোন রকম অশান্তির সৃষ্টি করতে পারে না। সুপ্তাবস্থায় থাকা জননযন্ত্রের এই ক্ষত কোন রকম কুচিকিৎসার সুযোগ পেলেই স্বমূর্তি ধারণ করে, বিউবোরূপে আত্মপ্রকাশ করে এবং সোরা সঙ্গে মিলিত হয়ে দেহের অভ্যন্তরে জটিল ব্যাধির সৃষ্টি করে।
বাত বা পক্ষাঘাত ঃ আমরা জানি সিফিলিনামের সঙ্গে বাত বা পক্ষাঘাতের নিকট সম্বন্ধ। যেমন মুখে, জিহŸায়, চক্ষুপত্রে, হস্তপদে, উদরযন্ত্রে পক্ষাঘাত। এই পক্ষাঘাতের কারণেই রোগি ¯œায়ুবিক বেদনায় ভোগে, আক্ষেপ দেখা দেয়, মৃগীরোগ প্রকাশ পায় কিংবা স্বাভাবিক জ্ঞানবুদ্ধির বিকাশ না হওয়ায় বা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে রোগি অনেক সময় উম্মাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে। পক্ষাঘাত দৈহিক মানসিক দুটিই হতে পারে। যদি এমন দেখা যায় যে, রোগির দৈহিক কাঠামো সৌষ্ঠব বর্জিত, বিকৃত বা পূর্ণ নয় তাহলে তার মূলে সিফিলিটিক মায়াজম ক্রিয়াশীল থাকে।
দৈহিক বিকৃতি ঃ লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, অনেকের মস্তকটি উঁচুনীচু বা অসমান, ঠোঁট দুটি ফাটা ফাটা বা কাটা, শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ক্ষতযুক্ত, সারাদেহে তা¤্রবর্ণের উদ্ভেদ, গলায় ক্ষত, দন্ত বিকৃত, অস্থি আক্রান্ত, কেশপতন, দুরারোগ্য কোন ক্ষত, গৃন্থিবিকৃতি, দৃষ্টিনাশ, জন্মের পর অনেক শিশুর বহুদিন যাবৎ নাড়ি দিয়ে রস-রক্ত পড়া, চর্ম উঠে যাওয়া বা শ্রীহীন হওয়া, সারাদেহ শুকিয়ে হাড়-পাঁজরা বেরিয়ে আসা, হাড়বৃদ্ধি, অনেক রমণীর বারবার গর্ভ¯্রাব হওয়া, রিকেট বা পুঁয়ে পাওয়া শিশু- এ বিকৃতির মূলে ক্রিয়া করে সিফিলিস বা উপদংশ। রোগীর বাহ্যিক অবয়ব দেখে অর্থাৎ দৈহিক বিকৃতি দেখে একনজরে চিনে নেওয়া যায় যে, ইতি মিঃ সিফিলিনাম।
রাত্রে/নিশীথে বৃদ্ধি ঃ সিফিলিনামের কাছে রাত্রি যেন কালরাত্রি। সন্ধ্যা হতে না হতেই যাবতীয় রোগের প্রকোপ বাড়তে থাকে এবং রাত যত বাড়তে থাকে পীড়ার উপদ্রæপ ততই দ্বিগুণতর হতে থাকে। রাত্রি হবার সঙ্গে সঙ্গে রোগিচিত্তে আতঙ্গের ভাব তৈরি হয়। রোগির মনে হয় এটাই তার শেষ রাত্রি। শিরঃশুল, হৃদশুল, মলান্ত্রের ক্ষত, চক্ষরোগ, বাত, পক্ষাঘাত, অস্থিক্ষত, পুতিনস্য, হাঁপানি, কাশি, শ্বাসকষ্ট, মানসিক বিকৃতি, মৃগি, স্বরভঙ্গ, মুখক্ষত- সব রোগই রাত্রে বৃদ্ধি পায় এবং রোগীকে অস্থির করে তোলে। মার্কসলের রোগীও রাত্রিকে ভয় করে কারণ তারও সব রোগ রাত্রে বৃদ্ধি পায়। আবার ল্যাকেসিসও নিদ্রায় বৃদ্ধি তাই রাত্রিকে ভয় করে।
অনিদ্রা ঃ সিফিলিনামের সকল বৃদ্ধি রাত্রে বলে এর রোগির চক্ষে নিদ্রার লেশমাত্র থাকেনা। অনিদ্রায় সিফিলিনামকে সবার অগ্রে রাখুন। অনিদ্রাজনিত কারণে রোগী মনে করতে থাকে যে সে উম্মাদ হয়ে যাবে।
জীর্ণশীর্ণ ঃ সিফিলিনাম ঔষধটি উপদংশ ক্ষতের বিষ থেকে তৈরি এবং উপদংশ বিষ দুষ্ট জীর্ণশীর্ণ ব্যক্তির ক্ষেত্রেই এটি অধিকতর প্রযোজ্য। ক্ষয়দোষ।
স্মৃতিশক্তিরলোপ/বোকাটে ঃ সিফিলিনাম ঔষধটিতে স্মৃতিশক্তির লোপ আছে। ভীষণ বোকাটে। স্মৃতিশক্তিহীনতা এনাকার্ডিয়ামেও প্রবলভাবে আছে। আবার মেডোরিনামেও আছে। সুতরাং ঔষধের তুলনামূলক পাঠ নেয়া চাই।
প্রবল মদ্যপানেচ্ছা ঃ যদি কখনো কোন রোগীচরিত্র প্রবল মদ্যপানের ইচ্ছা বা বংশানুক্রমিক মদ্যপানের ইচ্ছা লক্ষ করেন তাহলে সিফিলিনাম রোগীর কু-অভ্যাসটি নিশ্চয় দূর করবে। উপদংশরোষ দুষ্ট কোন রোগীর মধ্যে মদ্যপান করার অভ্যাসে আপনি সিফিলিনাম উচ্চ শক্তির দুটি মাত্রা দিয়ে দেখুন। মদ্যপায়ীদের জন্য অনেকে লিডাম দেন, অনেকে কফিয়া ব্যবহার করেন। ঔষধ দুটি মহাদামী। ল্যাকেসিসও মদ্যপায়ীদের জন্য উত্তম ক্রিয়াশীল ঔষধ, তবে ক্ষেত্র থাকা চাই।
ইচ্ছাশক্তির বিকৃতি ঃ সিফিলিনাম মানবের ইচ্ছাশক্তিকে বিকৃত করে। যে কাজটি ঘৃণার, যেটি অমর্যাদার, যাকিছু সম্মানহানীর- সেইসব কাজ সিফিলিনাম অবলীলায় করতে থাকে। তার ইচ্ছা শক্তি এমনই বিকৃত হয়ে পড়ে যে, যা কিছু ঘৃণার্হ তাই-ই তার কাছে তৃপ্তিকর বলে মনে হয়। ইচ্ছাশক্তি যেমন বিকৃত হয়ে পড়ে তেমনি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে বিকৃতিভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ইচ্ছাশক্তিহীনতার স্বরূপ উদঘাটন করে রোগীর অক্ষুধা, অজীর্ণতা, কেরিজ, নিক্রোসিস, মৃগী, উম্মাদ, আক্ষেপ, ¯œায়ুশুল, কোষ্ঠকাঠিন্য, চক্ষুরোগ, আলোকাতঙ্ক সহকেই দূর করা যায়।
খর্বতা ঃ শারীরিক ও মানসিক খর্বতা। কালা ও বোবা উপদংশকেই নির্দেশ করে। তাই সিফিলিনাম তাদের উত্তম ঔষধ তাতে সন্দেহ নাই।
উম্মাদগ্রস্ত ঃ দৈহিক ও মানসিক খর্বতা বা বিকৃতির কারণে অনেক সময় রোগী উম্মাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে বা উম্মাদ হওয়ার ভয়ে ভীত হয়।
ক্ষত বা চর্মরোগ ঃ সিফিলিনামের রোগী জন্মের পর থেকে নানা রকম ক্ষত বা চর্মরোগে ভুগতে থাকে। এই ক্ষত শেষ পর্যন্ত অস্থি আক্রমণ করে। কণ্ঠ ও ঘাড়ের গ্রন্থিগুলি ফুলে ওঠে, শক্ত হয়। ক্ষত নালী ঘায়ে পরিণত হয। একটির পর একটি ফোঁড়া হতে থাকে। তার মুখে ক্ষত, কর্ণে পুঁজ, নাসিকায় ঘা বা ক্ষত, চক্ষুপ্রদাহ, টনসিল বৃদ্ধি ও শক্ত- এ সব চলতে থাকে।
ক্ষত ও দুর্গন্ধ ঃ সিফিলিনামের ক্ষত যেমন গুণগত বৈশিষ্ট্য তেমনি দুর্গন্ধও তার বিশেষ গুণ। ক্ষত ও দুর্গন্ধের সম্মিলন এখানে পাবেন। এর মল দুর্গন্ধ, মূত্র দুর্গন্ধ, ঘর্ম দুর্গন্ধ, শ্বাস-প্রশ্বাস দুর্গন্ধ, মুখে দুর্গন্ধ, নাকে দুর্গন্ধ। প্রত্যেক ¯্রাব বা ক্ষত দুর্গন্ধময়। সিফিলিনামের মুখে ক্ষত হলে মুখ দূর্গন্ধে ভরে ওঠে তখন তার সঙ্গে দুদÐ কথা বলতে ঘৃণার উদ্রেক করে, নাকে ক্ষত হলে নাক দূর্গন্ধে ভরে যায়, মলদ্বারের ক্ষতেও দুর্গন্ধ, অস্থিক্ষতে পচা দুর্গন্ধ বের হয়। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের যেকোন স্থানের ক্ষতে ভীষণ দুর্গন্ধ।
ক্রোধ প্রবণতা ঃ সিফিলিনামে ক্রোধ বা ক্রুদ্ধ স্বভাব আছে। তার আচা আচরণে প্রতিনিয়ত ক্রোধের বহিঃ প্রকাশ ঘটে। ষ্ট্যাফিসেগ্রিয়া অধ্যায়ে আমরা রোগী চিত্তে ক্রোধ প্রবণতার যথেষ্ট পরিচয় পাই।
অকারণে ক্রন্দন ঃ অনেক সময় সিফিলিনামের রোগী শুধু শুধু অশ্রæ বিসর্জন করে, কাঁদে। কিন্তু রোগী কেন ক্রন্দন করে তার কারণটি নিজে বোঝে না অথবা বিনা কারণেও সে অশ্রæপাত করে।
ঘনঘন হাই তোলে ঃ রোগীর ক্রোধপ্রবণতায়, ক্রন্দনে, হাসিতে ঘনঘন হাই তোলায়।
চক্ষু ঃ দৃষ্টিশক্তির বিকৃতি ঘটে। চক্ষুর ¯œায়ু শুকিয়ে যায়। চক্ষুপ্রদাহে ঠান্ডা জল আরামদায়ক।
মুখ ঃ মুখে পক্ষাঘাত, মুখ বেঁকে যায়। রোগী বাক্যলোপ ঘটে। মার্কসলের ন্যায় জিহবায় দন্তের ছাপ।
অস্থিক্ষয় ঃ স্পাইনাল কেরিজ বা মেরুদন্ডের ক্ষয়প্রাপ্তি।
¯্রাবসমূহ ঃ নিশাঘর্ম। প্রচুর সাদ¯্রাব। প্রচুর ঋতু¯্রাব, মাসে দুবার। মূত্রকোষে ব্যথা। ঘুমঘোরে অসাড়ে প্র¯্রাব।
পাকস্থলী ঃ পাকস্থলীতে জ্বালা ও ক্ষত। ক্ষতজনিত বমি, বমি দিনের পর দিন চলতে থাকে। অ¤øদোষ।
কোষ্ঠকাঠিন্য ঃ কোষ্ঠকাঠিন্য এতবেশি যে, মলদ্বার ফেটে যায়, রক্ত ঝরে, ক্ষতের সৃষ্টি হয়।
হাঁপানি ঃ হাঁপানি রাত্রে, গ্রীষ্মে বা ঝড়জলে বৃদ্ধি পায়।
মূত্রযন্ত্র ঃ মূত্রকোষে ব্যথা হলে, ঘুমঘোরে অসাড়ে প্র¯্রাব।
চুলকানি ঃ হস্তপদের চর্ম উঠে যায়, চুলকানি।
স্ত্রীরোগ ঃ প্রচুর সাদা¯্রাব। প্রচুর ঋতু¯্রাব। মাসে দুবার।
গর্ভপাত ঃ যাদের প্রায়ই গর্ভ নষ্ট হয়ে থাকে। এর পশ্চাতে উপদংশদোষ বিশেষভাবে ক্রিয়াশীল তাকে। এরূপ ক্ষেত্রে সিফিলিনামের শরণ নেওয়অ ছাড়া গতি নেই।
শিশুর শীর্ণতা ঃ শিশুর সর্বাঙ্গ শুকিয়ে যায়।
শোথ ঃ শোথ- রাতে বৃদ্ধি পায়, দিনে কমে যায়। শোথ, উদরী, ন্যাবা।
গ্রন্থিস্ফীতি ঃ হজকিন ডিজিজে ঘাড়ের গ্রন্থিগুলি ফুলে গেলে সিফিলিনামের শরণ নেওয়া উচিৎ।
মাথা ঃ কেশ পতন। মস্তক বেদনা।
মন ঃ সিফিলিনামের মনটি বড় বিচিত্র। কোন বিষয়েই রোগী মনসংযোগ করতে পারে না। ভীষণ চঞ্চল কিন্তু অনুতপ্ত। কোন একটি স্থানে বেশীক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা বা বসে থাকা তার পক্ষে সম্ভব নয়-এমনই চঞ্চল। আরোগ্য সম্বন্ধে হতাশ থাকে। বিষাদভাব। জড়ভাব।
স্মৃতিনাশ/বিস্মৃতিপরায়ণ ঃ সিফিলিনামের স্মৃতিনাশ কথাটি ভাবার মত। রোগী তার নিকটজনের নাম ঠিকান পরিচয় সব ভুলে যায়। রোগী পরীক্ষায় যদি এরকম স্মৃতিনাশের পরিচয় মেলে তাহলে তার অনিদ্রা, অরুচি, খর্বতা, বিকৃতি, মাংসে অরুচি- এসবের পরিচয়ও মিলে যাবে। কেন্ট মহাশয় বলেন, ‘রোগী বিস্মৃতিপরায়ণ। দুর্বলচিত্ত, বিনা করাণে হাসে ও কাঁদে। সে লোকের মুখ, লোকের নাম, তারিখ ঘটনা, পুস্তকের কথা, স্থানের কথা স্মরণ করিতে পারেনা। সে হিসাব করিতে পারেনাা। আরোগ্য সম্বন্ধে হতাশ থাকে। বিষাদভাব। সে উম্মাদ হইয়া যাইতেছে বলিয়া ভয় পায়। জড়ভাব।’
এ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসা ঃ এ্যালোপ্যাথিক মতে সিফিলিসের চিকিৎসা এবং অসভ্য ব্যবস্থার মধ্যে পার্থক্য নাই। মার্কুরিয়াস ও আইওডিন ঘটিত কড় কড়া ঔষধ রোগীকে এতই দুর্বল করে যে, যাহারা ঐরূপ চিকিৎসার অধীন হয় তাহাদের সকলেই অকর্মণ্য ও দুর্বল হইয়অ পরে। কিন্তু তখনও তাহারা সিফিলিস হইতে আরোগ্য হয়না, যদি তাহারা আরোগ্য হইত তাহা হইলে আমরা তাহাদিগের দ্বারা অপসৃত লক্ষণগুলিকে ফিরাইয়া আনিতে পারিতাম না।