বিশ্বে বিভিন্ন মহামারীতে হোমিওপ্যাথির সাফল্যের তথ্য ও ঔষধের কার্যকারিতা।

——————————————————————–
হোমিওপ্যাথির ভাষায় জীবনী শক্তি (Vital Force/ Vital Principle) বা এলোপ্যাথির ভাষায় রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা (Immune System) একই বিষয় হলেও ভিন্ন নামে অভিহিত আরোগ্যকার্যে অদবদ্য ভূমিকা :
———————————————————————
যখন কোনো রোগশক্তির প্রতি সংবেদনশীল হয় তখনই মানুষ পীড়িত বা অসুস্থ হয়। প্রতিটি মানুষের মাঝে “আত্মা” ও “জীবনী শক্তি” রয়েছে এবং দুটোই অদৃশ্য সত্ত্বা।

ডা. স্যামুয়েল হ্যানিম্যান “জীবনী শক্তি” মতবাদ গ্রহণ করে হোমিওপ্যাথিতে প্রতিষ্ঠা করেন। এ বিষয়ে বলেন যে, জড় দেহের সকল চেতনা, শক্তি, সামর্থ্য, অনুভূতি, সুখ-দুঃখ অনুভব, চিন্তা-ভাবনা, স্মৃতিশক্তিসহ সকল প্রকার জৈব-ক্রিয়াকলাপের মূলে হলো জীবনী শক্তি। আত্মার অন্তঃপ্রবাহ জীবনীশক্তির মাধ্যমে জীবদেহকে সকল কর্মকান্ডের উপযোগী করে রাখে। আত্মা ও জীবনী শক্তি উভয়ই অদৃশ্য বটে কিন্তু একই জিনিস নয়। স্রষ্টার আদেশ ঘটিত আত্মার অন্তঃপ্রবাহের দরুণ জড়দেহ চেতনা লাভ করে। এই আত্মাটি অমর কিন্তু জীবনী শক্তি ক্ষয়শীল এবং জড়দেহটি ধ্বংসশীল।
বর্তমানে যে ইমিউনিটি সিস্টেমের (রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা) কথা বলছে তা ডা. স্যামুয়েল হ্যানিম্যান দুইশত বছর আগেই বলে গিয়েছেন। মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ করা, রোগাক্রান্ত হওয়া, রোগযন্ত্রণা ও রোগ লক্ষণ প্রকাশ করা, ইন্দ্রিয় সমূহের মাধ্যমে অনুভূতি গ্রহণ করা এবং রোগে আক্রান্ত হবার পর যথার্থ সদৃশ ঔষধ শক্তির সাহায্যে রোগ আরোগ্য করা ইত্যাদি জীবনী শক্তির প্রধান কাজ। আমরা তখনই পীড়িত হয় যখন আমাদের জীবনীশক্তি কোনো রোগশক্তির প্রতি সংবেদনশীল হয়। সহজ কথায় আমাদের জীবনী শক্তিতে যখন কোনো রোগের প্রতি চাহিদা তৈরী হয় তখন সেই রোগে পীড়িত হই।
রোগ শক্তির বিরুদ্ধে নাছোড় জীবনী শক্তি (ভাইটাল ফোর্স) অবিরত সংগ্রাম করে চলেছে। সংগ্রামে পরাভুত হলেই সৃষ্টি করে অস্বাভাবিক লক্ষণরাজি। সাহায্যের নিমিত্ত বলবত্তর অধিকতর শক্তিশালী সদৃশ ঔষধ শক্তি যখন জীবনী শক্তির (ভাইটাল ফোর্স) সংস্পর্শে আসে, তখন অপেক্ষাকৃত দুর্বল রোগশক্তি আর টিকে থাকতে পারে না, দ্রুত অপসৃত হয়। ঔষধ শক্তির সীমিত ক্রিয়া শেষ হয়ে গেলে জীবনী শক্তি (ভাইটাল ফোর্স) সম্পূর্ণ মুক্ত হয় ও রোগী আরোগ্য লাভ করে।
এটাকে হোমিওপ্যাথিকরা বলে থাকে জীবনী শক্তি (ভাইটাল ফোর্স) এর কাজ নামে অভিহিত করে ও এলোপ্যাথরা এটাকে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা (ইমিউনিটি সিস্টেম) কাজ বলে অভিহিত করে আসছে।

কিভাবে প্রতিরোধক ব্যাক্টেরিয়া ও ভাইরাসের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হোমিওপ্যাথি সাহায্য করে :
——————————————————————
যেহেতু হোমিওপ্যাথি ক্ষতিহীন এবং কষ্টহীন উপায়ে কাজ করে কাজেই গতিশীল ঔষধ শক্তি গতিশীল রোগ, শক্তিকে পরাস্ত করে সুস্থতায় ফিরিয়ে আনে। এরদ্বারা দুইটি বিষয় অর্জিত হয়। প্রথমত সুক্ষাতি সুক্ষ্ম ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস দেহের কোন ক্ষতি না করে দেহ থেকে চলে যায় এবং দ্বিতীয়তঃ যেহেতু জীবনী শক্তি ভারসাম্যতা অর্জন করে ফলে ভবিষ্যতে ব্যক্তি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র রোগ জীবাণুর দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার বিরুদ্ধে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করে। এটাই হচ্ছে পরিপূর্ণ আরোগ্য বিধান, কাজেই এটাকে বলা হয় সর্বোত্তম উপায়ের সাদৃশ্য নীতিতে চিকিৎসা পদ্ধতি।

হোমিওপ্যাথি ঔষধ কিভাবে শরীরের (দেহের) উপর কাজ করে :
———————————————————————-
যেহেতু হোমিওপ্যাথি ঔষধ বিভিন্ন শক্তিকৃত শক্তি এবং কোন রাসায়নিক অস্তিত্ব থাকে না, কাজেই এটা দেহের উপর গতিশীল প্রক্রিয়ায় কাজ করে। হোমিওপ্যাথি “ঔষধ বটিকা” জিহ্বাতে রাখলে মুখের স্নায়ু প্রান্ত সমূহ উদ্দীপিত হয়। এই উদ্দীপনা মস্তিস্কের মজ্জাতে চলে যায় এবং সেখান থেকে আরোগ্যকর শক্তি অঙ্গ বা তন্ত্র যেখানে গতিশীল রোগ বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়েছে সেখানে চলে যায়। ঠিক যেমনটা বিদ্যুৎ প্রবাহের বেলায় তারের মধ্যে প্রবাহিত বিদ্যুৎ দেখা যায় না কিন্তু এর অস্তিত্ব ঈপ্সিত ফল দ্বারা প্রমাণিত হয়। হোমিওপ্যাথি ঔষধ তদ্রুপ তেমনি ভাবে কাজ করে থাকে।

হোমিওপ্যাথিতে প্রতিষেধক ও মহামারীতে রোগীর লক্ষণ ভিত্তিতে ঔষধ নির্বাচন এবং চিকিৎসা করা :
———————————————————————-
প্রতিষেধক ঔষধ নির্বাচন করা হয়ে থাকে যে কোনো মহামারীতে (মহামারীর প্রাইমারী স্টে‌জে) আক্রান্ত দশ জন বা বিশ জন রোগীর রোগ লক্ষণ সংগ্রহ করে যে কয়টা লক্ষণ কমন থাকে অর্থাৎ প্রায় সকলের মধ্যেই পাওয়া যায় সেই লক্ষণের উপর ভিত্তি করে। চিকিৎসক কর্তৃক পর্য‌বেক্ষিত কমন (যে কয়টি লক্ষণ সকলের ম‌ধ্যেই দৃষ্টিগোচর হয়) লক্ষণ গুলো হোমিওপ্যাথিক যে ঔষধটি সুস্থ মানবদেহে উৎপাদন করতে সক্ষম সেই ঔষধটিই হবে উক্ত মহামারীর জন্য যথার্থ প্রতিষেধক ঔষধ।
মহামারীতে আক্রান্ত রোগীর বা রোগীদের সেকেন্ডারী স্টেজের লক্ষণ বা ধাতুগত লক্ষণ নিয়ে কখনোই সঠিক প্রতিষেধক ঔষধ নির্বাচন করা সম্ভব নয়।
তবে সেকেন্ডারী স্টেজে যদি প্র‌তি‌টি রোগী‌কে স্বতন্ত্রভাবে পর্যবেক্ষণ করে তাদের লক্ষণ সমষ্টি অনুযায়ী একক ঔষধ সূক্ষ্ম মাত্রায় রোগীকে প্রদান করা যায় তাহলে অবশ্যই রোগী পরিপূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠবে।

মহামারী (Epidemic) :
মড়ক, যে সংক্রামক রোগে বহু লোক মৃত্যুবরণ করে। সংক্রামক রোগের দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে একটি স্বল্প সময়ের মধ্যে, সাধারণত দুই সপ্তাহ বা তার কম সময়ের মধ্যে জনসংখ্যার একটি বৃহৎ সংখ্যক লোককে। উদাহরণস্বরূপ, মেনিংকোকাল ইনফেকশনগুলিতে, প্রতি হেক্টর প্রতি ১০০,০০০ জন লোকের মধ্যে ১৫ টির বেশি ক্ষেত্রে আক্রমণের হার একটি মহামারী বলে মনে করা হয়।

মহামারী রোগে ১৮০১খ্রি. ডা. স্যামুয়েল হ্যানিম্যান এর হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা বিজ্ঞান এর সংবিধান “অর্গানন অব মেডিসিন” গ্রন্থ এর এফোরিজম ৩৩ ফুটনোট ১৭ তে হোমিওপ্যাথিক প্রতিষেধক আছে ও হোমিওপ্যাথি ঔষধ প্রয়োগ করে ভাল ফলাফল পেয়েছেন তা উল্লেখ করেছেন। যা ইংরেজি ও বাংলা অনুদিত অংশ সংযুক্ত আছে।

হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা পদ্ধতির জনক বিজ্ঞানী ডা. স্যামুয়েল হ্যানিম্যান এর “দি লেজার রাইটিং” গ্রন্থ এর ৩৭৬-৩৮৩ পৃষ্ঠায় হোমিওপ্যাথিক প্রতিষেধক সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।
তখনকার সময় scarlet fever এর জন্য তিনি হোমিওপ্যাথি ঔষধ Belladonna প্রতিষেধক হিসাবে ব্যবহার করেছিলেন।

তার দেখানো পদ্ধতি অনুসারে বিশ্বে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মহামারীতে ও সম্প্রতি চিকনগুনিয়া জ্বর, ডেঙ্গু জ্বরে হোমিওপ্যাথি প্রতিষেধক ও চিকিৎসায় হোমিওপ্যাথি সফলতা অর্জন করেছে।
বর্তমানে বিশ্বে মহামারী রুপ ধারণকারী কোভিড-১৯ করোনা ভাইরাস এর প্রতিষেধক হিসাবে হোমিওপ্যাথি ঔষধ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকগণ পরীক্ষা পরীক্ষামূলক ভাবে দিতে পারেন।
এছাড়া হোমিওপ্যাথিক লক্ষণ ভিত্তিতে ডা. স্যামুয়েল হ্যানিম্যান এর অর্গানন অব মেডিসিন, দি লেজার রাইটিং, হোমিওপ্যাথিক মেটেরিয়া মেডিকা, হোমিওপ্যাথিক রেপার্টরী সহ অন্যান্য গ্রন্থের সহায়তায় সফলতার সহিত হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা প্রদান করা যাবে।

হোমিওপ্যাথি প্রতিষ্ঠার পর হতেই বিভিন্ন মহামারীতে সাফল্যের সাথে চিকিৎসা করে এসেছে এবং তুলনাযোগ্য প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রচলিত চিকিৎসা ধারার তুলনায় তার সফলতা ছিলো আশ্চর্যজনক রকমের বেশি। ডা. স্যামুয়েল হ্যানিমান তার রচনাকৃত হোমিওপ্যাথির মূল গ্রন্থ ‘অর্গানন অব মেডিসিন’-এ মহামারী সম্বন্ধে বিশেষভাবে আলোচনা করেছেন এবং হোমিওপ্যাথি পদ্ধতি মোতাবেক তিনি কীভাবে এর চিকিৎসা করতে হবে, সে ব্যাপারে পূর্ণাঙ্গ নির্দেশনা দিয়ে গিয়েছেন। কেবল তাত্ত্বিক ধারণা নয়, সর্বপ্রথম ১৮০১ সালে স্কারলেট ফিভারের মহামারীতে তিনি বেলোডোনা ঔষধটির রোগ প্রতিরোধে ব্যাপক সক্ষমতার বাস্তব প্রমাণ দিলেন এবং পরবর্তীতে নেপোলিয়ান আর্মিতে হওয়া টাইফাস মহামারীতে তিনি নিজে চিকিৎসা করে নজির স্থাপন করলেন তার আরোগ্য ক্ষমতার শ্রেষ্ঠত্বের। এরপর থেকে বিগত ২০০ বৎসরে বিভিন্ন এপিডেমিক (মহামারী) তে হোমিওপ্যাথির ফলপ্রসূ ভূমিকার বহু নজির বিদ্যমান। অর্গানন অব মেডিসিন গ্রন্থের ৬ষ্ঠ সংস্করণের ১০০ হতে ১০৪ সূত্রে Epidemic Disease (মহামারী রোগ) বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ করেছেন। মহামারী রোগে প্রচলিত চিকিৎসার পাশাপাশাই হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা সফলতার কিছুসংখ্যক দৃষ্টান্ত সংক্ষেপে উল্লেখ করা হলো-

১। ১৭৯৯ ও ১৮০১ সালে মহামারী আকারে দেখা দেয়া স্কারলেট ফিভার কিভাবে হোমিওপ্যাথি ঔষধ বেলেডোনা-৩০ প্রয়োগ করে ডা. স্যামুয়েল হ্যানিম্যান অন্যান্য চিকিৎসা ব্যবস্থার চেয়ে রোগীর মৃত্যুর হার কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন।

২। ১৮১৩ সালে জার্মানীর টাইফাস ফিভার মহামারীতে প্রচলিত চিকিৎসা ধারায় মৃত্যুর হার ছিল যেখানে ৩০% সেখানে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় মৃত্যুর হার ছিল ২%।

৩। ১৮৩১ সালে অস্ট্রেলিয়ার কলেরা মহামারীতে প্রচলিত চিকিৎসায় মৃত্যুর হার ৪০% থাকলেও হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় মৃত্যুর হার ছিল মাত্র ১০%।

৪। ১৮৪৯ সালের যুক্তরাষ্ট্রের সিনসিনাটির কলেরা মহামারীতে হোমিওপ্যাথির সাফল্য ৯৭% প্রচলিত চিকিৎসায় সাফল্য ৯৭% প্রচলিত চিকিৎসায় সাফল্য ছিল মাত্র ৪০% থেকে ৫০%।

৫। ১৮৫৪ সালে যুক্তরাজ্যের লন্ডনের কলেরা মহামারীতে প্রচলিত চিকিৎসায় মৃত্যুর হার ছিল ৫৯.২% আর হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় মৃত্যুর হার ছিল মাত্র ৯%।

৬। ১৮৫৫ সালে আফ্রিকার রিও-র কলেরা মহামারীতে প্রচলিত চিকিৎসায় মৃত্যুর হার ছিল ৪০% থেকে ৬০% আর হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় মৃত্যুর হার ছিল মাত্র ২%।

৭। ১৮৬২ থেকে ১৮৬৪ সালের নিউইয়র্ক ডিপথেরিয়ার সংক্রমণে প্রচলিত চিকিৎসায় মৃত্যুর হার ছিল ৮৩.৬% আর হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় মৃত্যুর হার ছিল মাত্র ১৬.৪%।

৮। ১৮৭৮ সালে অামেরিকার ইউলো ফিভার মহামারীতে প্রচলিত চিকিৎসায় মৃত্যুর হার ছিল ১৫.৫% আর হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় মৃত্যুর হার ছিল মাত্র ৬%।

৯। ১৯১৮ সালে স্প্যানিশ ফ্লু মহামারীতে প্রচলিত চিকিৎসায় মৃত্যুর হার ছিল মাত্র ২৮.২% আর হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় মৃত্যুর হার ছিল ১.০৫%।

এছাড়া ১৯৭৪ সালে ব্রাজিলের ম্যানিনজাইটিস, ১৯৭১ সালের ভারতের জাপানিজ এনসেফালাইটিস, ২০০৭ সালে কিউবার ল্যাপটোস্পাইরোসিস এবং ২০০৯ সালে ভারতের সোয়ান ফ্লু ইত্যাদি রোগ মহামারী (Epidemic) আকারে দখা দেবার ফলে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে হোমিওপ্যাথির সফলতা ছিল শীর্ষে। মৃত্যুর হার ছিল না বললেই চলে।
স্মরণকালের ডেঙ্গু জ্বর ও চিকনগুনিয়া জ্বর রোগের প্রার্দুভাবেও হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার সাফল্য রয়েছে।
১৯৯৫ সালে কিউবাতে কেরাটোকঞ্জাকটিভকইটিস রোগে ও ২০০৭ সালে ভারতের কেরালাতে চিকনগুনিয়া রোগে হোমিওপ্যাথি ঔষধ প্রয়োগ করে সফলতা পাওয়া যায়।

সম্প্রতি ২০১৫ সালে বাংলাদেশে বেসরকারী আশা বিশ্ববিদ্যালয় ও বিবিসি- বাংলা যৌথ গবেষণায় জানায় বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৪০% লোক হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা গ্রহণ করে আসছে।

সেখানে জেনারেল স্ট্যাটিসটিকস, বিভিন্ন সময়ে দেখা দেয়া কলেরা, স্কারলেট ফিভার, ইয়ালো ফিভার, নিউমোনিয়া, টাইফাস ফিভার, ডিফথেরিয়া, শিশুরোগ, উন্মত্ততা ইত্যাদি এপিডেমিক ও রোগগুলোর বিস্তারিত তথ্য-উপাত্ত, পরিসংখ্যান, বিভিন্ন হাসপাতালের রিপোর্ট ও তথ্যসূত্রসহ যে প্রমাণ ও বর্ণনা উপস্থাপন করা হয়েছে- তা দেখলে আশ্চর্য হয়ে ভাবতে হয়, চোখের সামনে মানুষের আরোগ্যকারী এই উপায় থাকা সত্ত্বেও কেন তাকে যথাযোগ্য মর্যাদা প্রদান করছি না?

বর্তমানে বিশ্বব্যাপি করোনা ভাইরাস দুর্যোগ উপস্থিত হয়েছে, জীবন আজ যে ঝুঁকিতে ভীতসন্ত্রস্ত্র হয়ে আছে। সেখানে কি সময় হয়নি হোমিওপ্যাথিককে তার অতীত সমৃদ্ধির মতো বর্তমানেও চমৎকার কার্যকারিতা প্রদর্শন করা ও হাজার হাজার মানুষের সুস্থতা নিশ্চিত করতে সুযোগ দেবার?

কোভিড-২০১৯ করোনা ভাইরাস মহামারী :
——————————————————–
করোনা ভাইরাস বলতে ভাইরাসের একটি শ্রেণীকে বোঝায় যেগুলি স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং পাখিদেরকে আক্রান্ত করে। মানুষের মধ্যে করোনা ভাইরাস শ্বাসনালীর সংক্রমণ ঘটায়। এই সংক্রমণের লক্ষণ মৃদু হতে পারে, অনেক সময় যা সাধারণ সর্দি-কাশির ন্যায় মনে হয় (এছাড়া অন্য কিছুও হতে পারে, যেমন রাইনো ভাইরাস), কিছু ক্ষেত্রে তা অন্যান্য মারাত্মক ভাইরাসের জন্য হয়ে থাকে, যেমন সার্স, মার্স এবং কোভিড-১৯। অন্যান্য প্রজাতিতে এই লক্ষণের তারতম্য দেখা যায়। যেমন মুরগির মধ্যে এটা উর্ধ্ব শ্বাসনালী সংক্রমণ ঘটায়, আবার গরু ও শূকরে এটি ডায়রিয়া সৃষ্টি করে। মানবদেহে সৃষ্ট করোনা ভাইরাস সংক্রমণ এড়ানোর মত কোনো টিকা বা অ্যান্টিভাইরাল এলোপ্যাথি ঔষধ আজও আবিষ্কৃত হয়নি।

করোনা ভাইরাসের শ্রেণী বিন্যাস :

গ্রুপ: ৪র্থ গ্রুপ ((+)ssRNA)
বর্গ: নিদুভাইরাস
পরিবার: করোনাভাইরদা
উপপরিবার: করোনাভাইরিনা
গণ: আলফাকরোনাভাইরাস
বেটাকরোনাভাইরাস
ডেল্টাকরোনাভাইরাস
গামাকরোনাভাইরাস

আদর্শ প্রজাতি: করোনা ভাইরাস

করোনাভাইরাস রাইবোভিরিয়া পর্বের নিদুভাইরাস বর্গের করোনাভিরিডি গোত্রের অর্থোকরোনাভিরিন্যা উপ-গোত্রের সদস্য। তারা পজিটিভ সেন্স একক সূত্রবিশিষ্ট আবরণীবদ্ধ বা এনভেলপড ভাইরাস। তাদের নিউক্লিওক্যাপসিড সর্পিলাকৃতির। এর জিনোমের আকার সাধারণত ২৭ থেকে ৩৪ কিলো বেস-পেয়ার (kilo base-pair) এর মধ্যে হয়ে থাকে যা এ ধরনের আরএনএ ভাইরাসের মধ্যে সর্ববৃহৎ।
করোনাভাইরাস শব্দটি লাতিন ভাষার করোনা থেকে নেওয়া হয়েছে যার অর্থ “মুকুট”। কারণ দ্বিমাত্রিক সঞ্চালন ইলেকট্রন অণুবীক্ষণ যন্ত্রে ভাইরাসটির আবরণ থেকে গদা-আকৃতির প্রোটিনের কাঁটাগুলির কারণে এটিকে অনেকটা মুকুট বা সৌর করোনার মত দেখায়। ভাইরাসের উপরিভাগ প্রোটিন সমৃদ্ধ থাকে যা ভাইরাল স্পাইক পেপলোমার দ্বারা এর অঙ্গসংস্থান গঠন করে। এ প্রোটিন সংক্রমিত হওয়া টিস্যু বিনষ্ট করে। ভাইরাসটি ডাইমরফিজম রুপ প্রকাশ করে। ধারনা করা হয়, প্রাণীর দেহ থেকে এই ভাইরাস প্রথম মানবদেহে প্রবেশ করে।

করোনা ভাইরাসের লক্ষণ সর্দি-কাশি দিয়েই শুরু হয়। হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা কোন রোগ ধরে হয় না লক্ষণ সমষ্টি নিয়ে হোমিওপ্যাথিক ঔষধ দিতে হয়। শুরুতেই যদি করোনার প্রাথমিক লক্ষণগুলো ও রোগীর ব্যক্তিগত লক্ষণ মিলিয়ে হোমিওপ্যাথিক ঔষধ প্রয়োগ করলে সমস্যা দ্রুতই কমে যায়। সেটা সাধারণ সর্দি-কাশিই হোক বা Covid-19 এর কারণেই হোক, সমস্যা আর জটিলতার দিকে যাবে না।

ভারতের সরকারের আয়ুশ মন্ত্রণালয় কোভিড-২০১৯ করোনা ভাইরাস এর প্রতিষেধক হিসাবে হোমিওপ্যাথিক ঔষধ Arsenic Alb 30 প্রয়োগ করতে নির্দেশনা প্রদান করেছেন। এছাড়া রোগ হলে লক্ষণ ভিত্তিতে হোমিওপ্যাথিক ঔষধ প্রদান করা।

ইতালি’র হোমিওপ্যাথ ডা. ম্যাসিমো মঙ্গিয়ালাভোরি করোনা ভাইরাসে হোমিওপ্যাথি ৩ ঔষধে সুস্থ করেন।
২৩ মার্চ, ২০২০ ম্যাসিমো মঙ্গিয়ালাভোরি লিখেছেন। ডা. ম্যাসিমো মঙ্গিয়ালাভোরি তিনটি হোমিওপ্যাথিক ঔষধে প্রতিকার সহ চিকিৎসার ক্লিনিক্যাল লক্ষণ গুলি শেয়ার করেছেন। যা তিনি সম্প্রতি COVID-19 করোনা ভাইরাসএর চিকিৎসায় ব্যবহার করেছিলেন। তিনি এই প্রাথমিক তথ্যটি এই আশায় উপস্থাপন করেন যে এই কঠিন সময়ে এটি অন্যের পক্ষে সহায়ক হতে পারে।

ইতালির মোডেনা শহরে ডা. ম্যাসিমো মঙ্গিয়ালাভোরি ১৯৮৪ সাল হতে হোমিওপ্যাথি Practices করেন। তিনি বিশ্বে একজন নেতৃস্থানীয় হোমিওপ্যাথ। তার গভীর অনুসন্ধানী মানুষিকতার ও গবেষণার জন্য তিনি আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত এবং শ্রদ্ধাভাজন।

২২ মার্চ ২০২০ পর্যন্ত তিনি ৮৪ জন করোনায় রোগী দেখেন। যার মধ্যে ৬৪ জন রোগী ৩/৪ দিনের মধ্যে পূর্ণরূপে সুস্থ হয়ে উঠেন বলে রিপোর্ট করেন।

তিনি হোমিওপ্যাথিক মেটেরিয়া মেডিকা নিয়ে গবেষণা করার সময় সমস্ত প্রাকৃতিক ঘটনা বিবেচনা করেন এবং এর নৃতাত্ত্বিক, শারীরিক, মনস্তাত্ত্বিক এবং দৃষ্টিভঙ্গিগত মূল বিষয়গুলি দিয়ে বিশ্লেষণ করেন। অতি সম্প্রতি তিনি করোনা নিয়ে তার ক্লিনিক্যাল অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ওয়েভ পোর্টল hpathy তে একটা আর্টিকেল প্রকাশ করেন।

Covid-2019 করোনা ভাইরাস হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় লক্ষণ অনুযায়ী Homoeopathic Medicine :
1. Chininum Muriaticum,
2. Grindelia,
3. Camphor

করোনা ভাইরাসের বৃদ্ধিকাল :
————————————-
১-১৪ দিন (২৪ দিন পর্যন্ত হতে পারে)

করোনা ভাইরাস এর লক্ষণ :
———————————–

রোগীর ১ম – ৩য় দিন :
—————————
১। হালকা সর্দি ও কাশি

রোগীর ৪র্থ দিন :
———————
১। হালকা গলা ব্যথা, ২। মাথা ঘোড়া, ৩। হালকা জ্বর, ৪। হালকা ডায়রিয়া হতে পারে

রোগীর ৫ম দিন :
——————–
১। কন্ঠস্বর হালকা ব্যথা, ২। জ্বর বেড়ে যাবে, ৩। শরীর ব্যথা বেড়ে যাবে, ৪। ডায়রিয়া বেড়ে যাবে

রোগীর ৬ষ্ঠ দিন :
———————
১। জ্বর ৯৮-৯৯ ডিগ্রি, ২। হালকা শুকনো কাশি, ৩। গলা ব্যথা বেড়ে যাবে, ৪। হালকা বমি হবে, ৫। শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাবে, ৬। ডায়রিয়া চলতে থাকবে

রোগীর ৭ম দিন :
———————
১। জ্বর ১০০ ডিগ্রি, ২। শুকনো কাশি ও কফ, ৩। শরীর ও মাথা ব্যথা বেড়ে যাবে, ৪। ডায়রিয়া অনেক বেড়ে যাবে

রোগীর ৮ম দিন :
———————
১। শরীর অনেক খারাপ হয়ে যাবে, ২। জ্বর ১০৪ ডিগ্রি, ৩। শ্বাসকষ্ট অনেক বেড়ে যাবে, ৪। মাথা ও শরীর তীব্র ব্যথা

জটিলতা :
————
৫% ক্ষেত্রে (নিউমোনিয়া, শ্বাসযন্ত্র বিকল হয়ে যাওয়া, শরীর পচন ধরা, একাধিক অঙ্গ বিকল হয়ে যাওয়া)

সুস্থ হয়ে উঠার সময় :
—————————
২ সপ্তাহ (কিছু ক্ষেত্রে ১ সপ্তাহ পর্যন্ত লাগতে পারে)

প্রথমে আমরা সর্দিজনিত সমস্যায় বেশি ব্যবহৃত হোমিওপ্যাথিক ঔষধ সম্পর্কে জানবো :
———————————————————————-
১। রোগের শুরুর ধাপে/প্রাথমিক পর্যায়ে Camphor, Aconite, Nux vom, Bryonia, Belladonna ঔষধগুলো বেশি নির্দেশিত হয়।

– প্রত্যেক্ষ বা পরোক্ষভাবে ঠাণ্ডার সংস্পর্শে যাওয়ার পর রোগী যদি মনে করে তার ঠাণ্ডা লাগবে তখন Camphor ০/১, ৬, বা ৩০ শক্তির কয়েকমাত্রা ঘন ঘন প্রয়োগ করলে অসুস্থতা থেকে বাঁচা যায়।

– শুষ্ক ঠাণ্ডার সংস্পর্শে আসার পর যদি জ্বর জ্বর লাগে, রোগীর মধ্যে অস্থিরতা প্রকাশ পায় তখন Aconite প্রয়োগ করতে হয়।

– সারাদিনই জ্বর জ্বর লাগা সাথে নাক বন্ধ, কপালে ব্যথা হলে Nux vomica

– নাক শুষ্ক, বন্ধ, নাকের গোড়াসহ কপালে ব্যথা, সঞ্চালনে/নড়াচড়ায় বাড়ে, ঠোট শুষ্ক, প্রচুর পিপাসা – Bryonia alba

– চোখ মুখ লাল, নাক থেকে সর্দিস্রাব, হঠাৎ রোগের আক্রমন, দপদপানি মাথাব্যথা – Belladonna

২। রোগের দ্বিতীয় পর্যায়ে (Second stage), যখন নাক থেকে প্রচুর সর্দিস্রাব হতে থাকে তখন Merc sol, Allium cepa, Arsenic album বেশি নির্দেশিত হয়।

৩। রোগের তৃতীয় পর্যায়ে (Third stage): নাক থেকে ঘন হলুদ সর্দিস্রাব হলে Pulsatilla, Sulphur। মুখের স্বাদ ও নাকে গন্ধ না পেলে পালসেটিলা, ক্রনিক কেইসে Sulphur

আসুন লক্ষণ ভিত্তিক হোমিওপ্যাথিক ঔষধ বিষয়ে আরেকটু বিস্তারিতভাবে জানি –

[1] Camphor officinalis :
প্রাথমিক পর্যায়ে বেশি নির্দেশিত হয়। প্রত্যেক্ষ বা পরোক্ষভাবে শরীর ঠাণ্ডা হয়ে যায়, নাক বন্ধ থাকে, নাক শুষ্ক, সুচালো। কপালে ব্যথা করে, গলাব্যথা। ঔষধটি পানির সাথে মিশিয়ে ঘন ঘন প্রয়োগ করলে (Camphor 6, 2 hourly) এবং যথাসময়ে দিতে পারলে কয়েক ডোজেই রোগী ভাল হয়ে যায়।

ডা: টাইলার বলেন যে কারো যদি শরীর ঠাণ্ডা হয় (ঠাণ্ডার সংস্পর্শে গিয়ে বা যেকোন ভাবে), শরীর এখনো গরম হয়নি, সর্দিস্রাব এখনো দেখা দেয় নি তবে Camphor টিংচার চিনির সাথে মিশিয়ে শরীর গরম না হওয়া পর্যন্ত ঘন ঘন খেলে আর সর্দি দেখা দেয় না।

ক্যাম্ফর টিংচার বহু ওষুধের কার্যকারিতা নষ্ট করে দেয় তাই এর মাদার টিংচার অন্য ওষুধের সাথে না রেখে অন্য ঘরে রাখতে হবে। (Kent) [তবে উচ্চ শক্তির জন্য এ কথা প্রযোজ্য না]

এ অবস্থা যদি পার হয়ে যায় এবং রোগীতে জ্বর দেখা দেয় তাহলে Aconite দিতে হয়।

[২] Aconitum nap :
শুষ্ক ঠাণ্ডা বাতাসের সংস্পর্শে যাওয়ার পরপর জ্বর জ্বর লাগে, প্রথমে শীত করে শরীর ঠাণ্ডা হয়, তারপর প্রচণ্ড জ্বর আসে, গা জ্বরে পুড়ে যায়, ততটা ঘাম থাকে না। মাথাব্যথা করে, নাক থেকে শুরুতে খুব বেশি সর্দিস্রাব হয় না। নাকের গোড়ায় ব্যথা হয়, গলায় জ্বলে খোঁচা মারা ব্যথা হতে পারে। পরবর্তীতে নাক থেকে প্রচুর স্রাব হয়। অস্থিরতা, প্রচুর পিপাসা।

– শুষ্ক ঠাণ্ডার সংস্পর্শে গিয়ে হঠাৎ রোগের আক্রমন।
– নাক শুষ্ক, সর্দি বের হয় না, নাকের গোড়ায় ব্যথা
– খোলাবাতাসে ভাল থাকে, কথা বললে বাড়ে
– পরে, প্রচুর হাঁচি হয়, নাক থেকে গরম স্রাব হতে থাকে। সকালেই বেশি যায়।
– উচ্চ জ্বর, গলা ব্যথা। গলায় জ্বালা ও হুলফোটান ব্যথা।
– কাশি, শুষ্ক, আক্ষেপিক কাশি, রাতে পারে। কাশতে কাশতে গলা বসে যেতে পারে।
– নিউমোনিয়া, ব্রঙ্কাইটিস এর শুরুর দিকে এটি নির্দেশিত হয়।
– রোগী ভীত হয়ে পড়ে, উদ্বিগ্নতা ও মৃত্যুভয় দেখা দেয়, খুবই অস্থিরতা প্রকাশ পায়।
– করোনা ভাইরাসের সংবাদে যারা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন তাদের জন্য এ ঔষধে উচ্চশক্তি কাজ দিবে।

[৩] Allium cepa :
– সর্দিস্রাব, নাক ও চোখে থেকে পানি পড়ে, সাথে মাথা ব্যথা করে।
– ঘন ঘন হাঁচি হয়, নাক থেকে যে স্রাব যায় সেটি ক্ষতকারি, নাক ও ঠোটে ঘায়ের মতো হয়ে যায়।
– চোখ থেকেও প্রচুর পানি পড়ে কিন্তু চোখের পানি ক্ষতকর না। (ইউফ্রোসিয়াতে এর উল্টো অর্থাৎ চোখের পানি ক্ষতকর কিন্তু নাকের পানি অক্ষতকর।)
– রোগী গরমকাতর, গরম ঘরে, আবদ্ধ কক্ষে বাড়ে, খোলা বাতাসে উপশম হয়। বিকালে সমস্যা বেশি হয়।
– পিপাসা
– ল্যারিক্স এর প্রদাহ হয়, কাশি দিলে মনে হয় স্বরনালী ছিড়ে যাবে। গলা চেপে কাশি দেয়। [hep, acon, dros, phos] [ML Tyler]
– ঠাণ্ডা বাতাসের নিশ্বাস নিলেই কাশি শুরু হয়।

শিশুদের ক্ষেত্রে প্রায়ই লাগে। নাকের প্রদাহজনি সর্দি, পরে প্রদাহ স্বরনালী, ব্রঙ্কাসে পৌঁছায়, কাশি দেখা দেয়। শ্বাস-প্রশ্বাসে মিউকাস জমে ঘরঘর শব্দ করে। [T.S. Iyer]

[৪] Belladonna :
– আকস্মিক প্রবল রোগাক্রমন।
– নাকের সর্দি অবরুদ্ধ হয়ে প্রচণ্ড মাথাব্যথা করে।
– মুখে ও মাথায় রক্তের প্রাবল্য। চোখ লাল, মুখমণ্ডল রক্তিমাভ।
– মাথা গরম, হাত-পা ঠাণ্ডা।
– দপদপানি ব্যথা। সবকিছুতে যন্ত্রনার প্রাবল্য। যন্ত্রনা হঠাৎ আসে হঠাৎ যায়।
– বুকে সর্দি কম থাকে। গলা শুষ্ক।
– গলা যেন কাঁচা হয়ে গেছে, দেখতে চকচকে লাল।
– শুষ্ক কাশি, গলা ছিড়ে যায়। স্বরনালীর প্রদাহ, স্বরনালী ফুলে যায়, স্বরভঙ্গ দেখা দেয়। খুব ব্যথা করে।
– উচ্চ জ্বর, শুষ্ক। পিপাসা থাকে না।

[৫] Bryonia alba :
– প্রায়ই নাক থেকে শুরু হয়, হাঁচি হয়, নাকের প্রদাহ হয়ে সর্দিস্রাব হয়, চোখ থেকে পানি পড়ে, প্রথম দিন চোখে নাকে, মাথায় ব্যথা হয়। তারপর নাকের পিছনভাগ , গলা, স্বরনালি (larynx), আক্রান্ত হয়। গলা ভেঙে যায়, ব্রঙ্কাইটিস দেখা দেয় পরবর্তীতে প্লুরার প্রদাহ এবং শেষে নিউমোনিয়া দেখা দেয়। [ML Tyler]
– শুষ্ক আক্ষেপিক কাশি, রাতে বাড়ে, পানি পান ও খাওয়ার পর বাড়ে, গরম কক্ষে প্রবেশ করলে বাড়ে, গভীরভাবে শ্বাস নিলে বাড়ে।
– কাশিতে বুকে শুঁই ফোটানোর মত ব্যথা করে, সাথে মাথাব্যথা করে, কাশিতে যেন মাথা ফেটে যাবে এমন লাগে।
– ব্রায়োনিয়ার রোগী, খিটখিটে স্বভাবের, প্রচুর পানি পিপাসা থাকে, চুপচাপ শুয়ে থাকতে চায়, কথা বলতে চায় না।
– সমস্ত মিউকাস মেম্ব্রেন শুষ্ক হয়ে থাকে। ঠোক শুকিয়ে যায়।
– ঠাণ্ডা ও শুষ্ক আবহাওয়ায় বৃদ্ধি।
– Dr. Manish Bhatia, UK এর Society of Homeopath এ ঔষধটিকে COVID-19 এর প্রফাইলেকটিক হিসেবে ব্যবহার করতে বলেছেন।

[৬] Nux vomica :
– এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি ওষুধ। Richard Pitcairn এ ঔষধটিকে বর্তমান করোনা ভাইরাসের প্রতিকার ও প্রতিরোধ ঔষধ হিসেবে সবার আগে বিবেচনা করেছেন।
– ঠাণ্ডার শুরুর পর্যায়ে ব্যবহৃত হয়। নাক বন্ধ, বা রাতে নাক বন্ধ হয়ে থাকে, দিনের বেলায়, গরম রুমে প্রচুর সর্দিস্রাব হয়। মাথার সামনের দিকে ব্যথা হয়।
– ঠাণ্ডা বাতাসের প্রতি খুবই সংবেদনশীল। গলা ব্যথা।
– খুব শীতকাতর রোগী, সামান্য নড়াচড়ায়, বা গায়ে আবরন সড়ালেই শীতার্ত হয়ে পড়ে। এমনকি প্রবল জ্বরের সময়ও আবৃত হয়ে থাকতে পছন্দ করে, নড়াচড়া করে না।
– একোনাইটের মতো শুষ্ক ঠাণ্ডা বাতাসের সংস্পর্শে রোগ দেখা দেয়, একোনাইট উদ্বিগ্ন আর নাক্স খিটখিটে।
– নাক বন্ধ হয়ে প্রচুর হাঁচি হয়, খোলাবাতাসে হাঁচি বাড়ে। খোলাবাতাসের সংস্পর্শে কাঁপতে থাকে। পানি পান করার পরও কাঁপতে থাকে।
– হাত পা, পিঠসহ সারাদেহে শীত লাগতে থাকে, গরম প্রয়োগেও শীত যায় না।
– নাক্স ভম এর রোগী খুব সংবেদনশীল বিশেষ করে, সামান্য বাতাস সহ্য হয় না, খিটখিটে স্বভাবের।

[৭] Mercurius sol :
– শীতে গায়ে কাটা দিয়ে উঠে। বিকালে বাড়ে, রাতে বাড়ে, বিছানায় বাড়ে।
– নাক থেকে পাতলা পানির মতো স্রাব হয়, সাথে হাঁচি। চোখ থেকে পানি পড়ে।
– গলাব্যথা, খোঁচামারা, হুলফোটান ব্যথা, সবসময় ঢোক গিলতে হয়, মুখে অনেক লালা জমে যায়।
– মুখ, নিশ্বাসে দুর্গন্ধ। লালাও দুর্গন্ধ।
– অল্পজ্বর কিন্তু প্রচুর ঘাম হয়, ঘামে জ্বর কমে না।
– নাকের সর্দি হাজাকর, সবুজাব বা পুজের মতোও হয়।
– গলা বসে যায়, শুষ্ক কাশি, গলায় খুসখুস করে।
– গরম ঘরে বৃদ্ধি পায় কিন্তু আবার ঠাণ্ডাও সহ্য করতে পারে না।
– জিহ্বা মোটা, থলথলে, দাঁতের ছাপ থাকে।

[৮] Gelsemium :
-1918-19 সালের ভয়াবহ স্প্যানিশ ফ্লুতে এ ওষুধটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে। Society of Homeopath, UK, ব্রায়োনিয়ার সাথে জেলসিয়াম ওষুধকেও প্রিভেন্টিভ ওষুধ হিসেবে রিকমেন্ড করেছে।
– নিদারুন দুর্বলতা, মাথাঘোরা, শরীর থরথর করে কাঁপে।
– জ্বরের সাথে অল্প পিপাসা থাকে।
– গরম আদ্র আবহাওয়ায় সর্দি।
– নাকের স্রাব হাজিয়ে যায়, নাকে ক্ষত হয়। নাক দিয়ে যেন গরম তপ্ত পানি বের হচ্ছে এমন লাগে।
– জেলসের সর্দি ধীরে ধীর বিকাশ লাভ করে।
– মৃদু শীতকালের ঠাণ্ডা-সর্দি ও জ্বরে এটি বেশি লাগে।
– বিরক্তিকর, খুসখুসে কাশি, আগুনের পাশে থাকলে কমে।
– সারা শরীরে ভারবোধ, খুব দুর্বল লাগে।
– পিঠে শীত লাগে, শীত পিঠ বেয়ে উপরে ওঠে আবার নামে।
– মাথাব্যথা।
– ফ্লুর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঔষধ [ML Tyler]

[৯] Arsenicum album :
– ভারতের AYUSH মন্ত্রণালয় এ ওষুধটিকে COVID-19 এর প্রতিরোধক ওষুধ হিসেবে খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
– নাক থেকে পাতলা স্রাব যায়, ক্ষতকারি স্রাব, উপরের ঠোট হাজিয়া যায়। নাক সময় বন্ধ থাকে, খুব বেশি হাঁচি হয়। হাঁচি দিলেও নাক খোলে না।
– নাকের মধ্যে একটা স্থানে সুড়সুড় করে যেন পালক দিয়ে সুড়সুড়ানি দিচ্ছে। হাঁচির পরও সুড়সুড়ানি কমে না, হাঁচি দিতেই থাকে।
– নাকেই ঠাণ্ডা যেনে আগে লাগে, আবহাওয়ার পরিবর্ততে হাঁচি হয়। প্রথমে নাকে ঠাণ্ডা লাগে এরপর ঠাণ্ডা বুকে যায়।
– আর্স সবসময়ই শীতে কাতর হয়, বাতাসের ঝাপটা সহ্য করতে পারে না।
– ঠাণ্ডায় যেন জমে যায়, যতই কাথা গায়ে দেয় ঠাণ্ডা যায় না। আগুনের কাছ থেকে সরে না। রক্ত যেন বরফের নালি দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে এমন লাগে।
– নাক জ্বলে, গলা জ্বলে, গরম পানি খেলে জ্বালা কমে।
– জ্বরের সময় শরীর খুব গরম হয়, তখন মনে হয় রক্তের নালি দিয়ে যেন ফুটন্ত পানি প্রবাহিত হচ্ছে।
– শীতে বাড়ে, মধ্যরাত, দুপুরের রোগ বাড়ে, রাতে বাড়ে, গরমে উপশম, গরম কক্ষে ভাল অনুভব করে।
– অস্থিরতা, ঘন ঘন অল্প পরিমানে পানি পান করে, মৃত্যুভয়।

[১০] Rhus toxicodendron :
-ঠাণ্ডা আদ্র আবহাওয়া থেকে রোগের উৎপত্তি। বিশেষ করে ঘামের সময় যদি ঠাণ্ডা আদ্র আবহাওয়ার সংস্পর্শে যায় তখন ঠাণ্ডা লেগে যায়। (Dulcamara)
– নাসাস্রাব; গলা লাল হয়ে ফুলে যায়।
– প্রত্যেক ঠাণ্ডাতে নাক বন্ধ হয়ে যায়।
– ঠান্ডায় বাড়ে, গরমে কমে।
– গাঢ় হলদে, দুর্গন্ধযুক্ত শ্লেষ্মা স্রাব হয়।
– রাতে, বিশ্রামে বাড়ে, রাতে অস্থিরতা দেখা দেয়, ভয় পায়।
– স্বরভঙ্গ হয়, গলা যেন ছিলে গেছে, খসখসে; কথা বলার শুরুতে বাড়ে কিছু কথা বলার পর স্বরভঙ্গ কমে।
– ঠাণ্ডা পানির পিপাসা, বিশেষ করে রাতে; কিন্তু ঠাণ্ডা পানি খেলে শীত লাগে এবং কাশি দেখা দেয়।
– অনাবৃত থাকলে বাড়ে।
– শরীর ব্যথা, যেন হাড় ব্যথা করে <রাতে, বিকালে; হাঁচি কাশিও বাড়ে।

[১১] Hepar Sulph :
– শুষ্ক ঠাণ্ডা বাতাসের সংস্পর্শে ঠাণ্ডা-সর্দি লাগে (acon, nux v), নাক, কান, গলা, স্বরনালি, বুক থেকে শ্লেষ্মা বের হয়।
– নাকে ঠাণ্ডা, প্রচুর স্রাব, যতবারই ঠান্ডা বাতাসের মধ্যে যায় ততবারই হাঁচি হয়।
– হাঁচি, নাক থেকে প্রথমে পাতলা পানির মতো স্রাব যায়, পরবর্তীতে স্রাব ঘন, হলদে হয়, দুর্গন্ধ শ্লেষ্মা।
– ঠাণ্ডার সংস্পর্শে গলা বসে যায়, কাশি হয়, নাক দিয়ে ঠান্ডা বাতাস প্রবেশ করলেই বাড়ে, হাত বা পা কাথার বাইরে বের করতে পারে না, বের করলেই কাশি।
– ঘাম বেশি, সারা রাত ঘামে, তাতে কোন উপশম হয় না।
– অতিসংবেদনশীল, স্পর্শ সহ্য হয় না, ব্যথায় রোগী খুব কাতর হয়ে পড়ে, ঠাণ্ডা বাতাস একদম অসহ্য। রুমের দরজা জানলা বন্ধ করে কোন ফাঁকফোকর থাকলে সেটাও বন্ধ করে।
– ঘরের মধ্যে কেউ যদি ঠাণ্ডা প্রবেশ করায় তাকে মারতে চায়।
– আদ্র গরম আবহাওয়ায় ভালবোধ করে।
– ডা: ফেরিংটন এ ওষুধকে রোগের শুরুতে ব্যবহার করতে নিষেধ করেছেন, তাতে নাকের সর্দি চাপা পড়ে বুকে জমে যেতে পারে। যদি ঠান্ডা বুকে জমে যায় তাহলে পরবর্তীতে ফসফরাস ভাল কাজ করে এবং রোগীকে আরোগ্য করে।

[১২] Phosphorus :
– একবার নাক থেকে প্রচুর সর্দিস্রাব হয় পরক্ষনেই নাক বন্ধ হয়ে যায়। পর্যায়ক্রমে এ অবস্থা চলতে থাকে। (নাক্স, পালস)
– গলাব্যথা, মাথাব্যথা, জ্বরজ্বর লাগে।
– নাকের সর্দি শুকিয়ে নাকে চটা পড়ে, সেটা শক্তভাবে নাকের ভিতর আটকে থাকে।
– নাকের একটা ছিদ্র খোলা থাকলে আরেকটা ছিদ্র বন্ধ থাকে।
– হাঁচি দিলে বুকে ও মাথায় ব্যথা করে।
– নাক ঝাড়লে রক্ত আসে, নাক লাল, চকচকে, ব্যথাযুক্ত।
– বুকে চাপবোধ
– শক্ত কাশি, বুক চেপে ধরে, শুষ্ক, যন্ত্রনাপূর্ণ, খোলা বাতাসে বাড়ে।
– ফসফরাসের ঠান্ডা বুক বা স্বরনালি থেকেই শুরু হয়।
– ঠান্ডা পানির পিপাসা, একাকী থাকেতে চায় না, লবন খায়, অন্ধকারে ভুতের ভয়। ঝড়বৃষ্টির ভয়।

করোনা ভাইরাস হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় রেজিষ্টার্ড হোমিওপ্যাথিক ডাক্তারদেরকে বাংলাদেশ সরকারের অনুমোদন প্রদান :
———————————————————————
বাংলাদেশের হোমিওপ্যাথি নেতা ডা. মো. আব্দুস সালাম (শিপলু) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নথি সহ লিখলে দেশব্যাপি জনমত গড়ে উঠলে রাষ্ট্রীয় বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথি বোর্ড এ সংক্রান্ত ২৩ মার্চ ২০২০খ্রি. হোমিওপ্যাথিক সরকারী “অফিস আদেশ” জারি করেছে। বাংলাদেশে জাতীয় সংবাদপত্রে ২৪ মার্চ ২০২০খ্রি. দৈনিক ইত্তেফাক, ২৫ মার্চ ২০২০খ্রি. দৈনিক যুগান্তর ও বাংলাদেশ প্রতিদিন এবং ২৬ মার্চ ২০২০খ্রি. দৈনিক জনকণ্ঠ এ সংক্রান্ত হোমিওপ্যাথিক সরকারী বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত করেছে।

মহামারীতে অতীতে বার বার হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা বিশ্বব্যাপি সাফল্য রেখেছে ও বর্তমানেও অবদান রাখবে।

তথ্যসূত্র:

Homoeopathic Book Organon of Medicine & The Lesser Writings (Dr. Samule Hahnemann), Practical Key to Homeopathy (Dr. Nazir Hossain), Website, hpathy Website, Others Documents & Reference…।

লেখক পরিচিতি :
ডা. মো. আব্দুস সালাম (শিপলু)
ডিএইচএমএস (রাজশাহী হোমিওপ্যাথিক মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতা), এমএসএস (এশিয়ান ইউনিভার্সিটি)

(চিকিৎসক, শিক্ষক, কলামিস্ট ও প্রাক্তন সাংবাদিক)
বগুড়া, বাংলাদেশ।