বাংলাদেশে হোমিওপ্যাথি বোর্ড প্রতিষ্ঠার ইতিহাস

স্বাধীন বাংলাদেশে হোমিওপ্যাথি বোর্ড প্রতিষ্ঠা ও ডি এইচ এম এস কোর্স প্রবর্তন এবং হোমিওপ্যাথির বিকাশ
১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানী সৈন্যদের বিনা শর্তে আত্মসমপর্ণের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানে পশ্চিম পাকিস্তানীদের শাসন ও শোষণ চিরদিনের জন্য বন্ধ হয়ে যায় এবং স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ রাষ্ট্রের পত্তন হয়। স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর নির্দেশক্রমে বাংলাদেশ সরকার এক আদেশের মাধ্যমে হোমিওপ্যাথিক বোর্ড গঠন করে। বোর্ডের নামকরণ করা হয় “বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথি বোর্ড” এবং কোর্সের নামকরণ করা হয় ডি.এইচ.এম.এস.। বাংলাদেশে হোমিওপ্যাথির আনুষ্ঠানিক শিক্ষা ডি.এইচ.এম.এস. কোর্স পরিচালনা, সিলেবাস প্রণয়ন, পরীক্ষা গ্রহণ, হোমিওপ্যাথিক কলেজগুলোর অনুমোদন ও নিয়ন্ত্রণ, ডি. এইচ. এম. এস. পাশ করা চিকিৎসকদের চিকিৎসা সনদ ও রেজিস্ট্রেশন প্রদানের দায়িত্ব বোর্ডকে দেয়া হয়।
১৯৭২ সাল হতে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত সরকার নিয়োগকৃত এ্যাডমিনেস্ট্রেটর দ্বারাই বোর্ড পরিচালিত হয়েছে। ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ সরকার এক অর্ডিন্যান্স এর মাধ্যমে “বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক প্র্যাকটিশনার্স অর্ডিন্যান্স-১৯৮৩” জারী করে। এই অর্ডিন্যান্স ও রেগুলেশন ১৯৮৫ এর বিধি-বিধানের আলোকেই বর্তমানে বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথি বোর্ড এর কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। বর্তমানে সরকার মনোনীত ১ জন চেয়ারম্যান ও ১৭ জন সদস্যসহ মোট ১৮ জন সদস্য নিয়ে “বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথি বোর্ড পরিচালনা পরিষদ” গঠিত হয়েছে এবং বোর্ড পরিচালিত হচ্ছে।
“বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথি বোর্ড” একটি স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান এবং গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধিভূক্ত প্রতিষ্ঠান। এই বোর্ডের ১৯৮৫ সনে প্রণীত একটি উন্নত মানের সিলেবাস দ্বারা সমগ্র বাংলাদেশে ৫০টি বেসরকারী স্বীকৃত হোমিওপ্যাথিক মেডিক্যাল কলেজের মাধ্যমে ডি. এইচ. এম. এস. কোর্স পরিচালিত হচ্ছে। ৪ (চার) বছর মেয়াদী ডিপ্লোমা ইন হোমিওপ্যাথিক মেডিসিন এন্ড সার্জারী (ডিএইচএমএস) কোর্সের ১ম বর্ষ থেকে ৪র্থ (চুড়ান্ত) বর্ষ পর্যন্ত সকল বর্ষের একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনা ও ৬ মাসের ইন্টার্ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা এবং পেশাগত পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের সনদ ও রেজিস্ট্রেশন প্রদান বোর্ডের প্রধান দায়িত্ব। বর্তমানে বোর্ড কর্তৃক প্রদত্ত রেজিস্টার্ড ডি. এইচ. এম. এস. চিকিৎসকের সংখ্যা প্রায় ২৫,০০০ জন। এই চিকিৎসকগণ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বল্প ব্যয়ে জনগণকে স্বাস্থ্য সেবা প্রদান করে জাতীয় স্বাস্থ্য সেবায় বিশেষ ভূমিকা পালন করছে।
বি এইচ এম এস কোর্স প্রবর্তন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক হোমিওপ্যাথি কোর্সকে স্বীকৃতি প্রদান
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা বিজ্ঞান শিক্ষার ২টি কোর্স বাংলাদেশে চালু আছে। একটি বি. এইচ. এম. এস. কোর্স ও অন্যটি ডি. এইচ. এম. এস. কোর্স। বি. এইচ. এম. এস. কোর্স ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসী অনুষদের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয় এবং ডি. এইচ. এম. এস. কোর্স বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথি বোর্ড এর নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়। এর মধ্যে ডি. এইচ. এম. এস. কোর্সটি সবচেয়ে পুরনো এবং পাকিস্তান আমল থেকেই এদেশে চালু আছে, অন্যদিকে বি. এইচ. এম. এস. কোর্স স্বাধীন বাংলাদেশে ডি. এইচ. এম. এস. পাশ করা চিকিৎসকদের আন্দোলনের ফসল হিসাবে ১৯৮৬ সনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃতি অর্জন করে।


সরকারি হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ
বিএইচএমএস কোর্সের মেয়াদ ৫ বছর একাডেমিক শিক্ষা এবং ১ বছর ইন্টার্নশীপ, ডিএইচএমএস কোর্সের মেয়াদ ৪ বছর একাডেমিক শিক্ষা এবং ৬ মাস ইন্টার্নশীপ। বাংলাদেশে বি.এইচ.এম.এস কোর্স সর্ব প্রথম ঢাকাস্থ বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক মেডিক্যাল কলেজে চালু করা হয় এবং এই কলেজের ছাত্রদের দাবীর প্রেক্ষিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এই কোর্সকে স্বীকৃতি প্রদান করে ও কলেজটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কনস্টিটিউয়েন্ট কলেজ হিসাবে অধিভূক্ত হয়। এই কলেজের উপাধ্যক্ষ ডাঃ মোহাম্মদ হোসেন ছিলেন বি. এইচ. এম. এস. কোর্স চালুকরণের প্রাণপুরুষ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক বি. এইচ. এম. এস. কোর্সকে স্বীকৃতি প্রদানের জন্য তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল মান্নানকে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক সমাজ চিরদিন শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে। বহু ত্যাগ, সংগ্রাম এবং দাবীর প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকার ১৯৮৯ সালে “সরকারী হোমিওপ্যাথিক ডিগ্রী কলেজ” মিরপুরে প্রতিষ্ঠা করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ১৯৮৯-৯০ শিক্ষাবর্ষ হতে এই কলেজে শিক্ষা কার্যক্রম চালু হয়। ঢাকার মিরপুরস্থ “সরকারী হোমিওপ্যাথিক ডিগ্রী কলেজ” এবং ঢাকার গুলিস্তানের সন্নিকটে টয়েনবি সার্কুলার রোডে অবস্থিত “বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক মেডিক্যাল কলেজ” এই উভয় কলেজ হতে বি. এইচ. এম. এস. পাশ করে বহু ছাত্র-ছাত্রী জাতীয় স্বাস্থ্য সেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন
বর্তমান বাংলাদেশে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা বিজ্ঞান শিক্ষার যে সুন্দর ব্যবস্থা আমরা দেখছি এর পেছনে রয়েছে বহু জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তির ত্যাগ তিতিক্ষা আন্দোলন ও সংগ্রামের ইতিহাস। হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা বাংলাদশে এখন জনপ্রিয় চিকিৎসা পদ্ধতি,এই জনপ্রিয়তার পেছনে রয়েছে বাংলাদেশ সরকারের ভূমিকা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃতি, বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথি বোর্ডের কার্যক্রম; পেশাদার, অপেশাদার, প্রশিক্ষিত, অপ্রশিক্ষিত হোমিওপ্যাথদের সেবার মনোভাব; বিভিন্ন হোমিও সংগঠনের কার্যক্রম, বিভিন্ন হোমিওপ্যাথিক পত্রিকার প্রকাশনা এবং সাধারণ জনগণের আস্থা ও চিকিৎসা গ্রহণের দ্বারা আরোগ্য লাভ। এই নিবন্ধের মাধ্যমে নাম জানা-অজানা সকল পৃষ্ঠপোষকতা প্রদানকারী হোমিও অনুরাগীর প্রতি রইল আমার শ্রদ্ধাঞ্জলী।
Source: “ভারতে হোমিওপ্যাথি-হর্ষবর্দ্ধন ঘোষ”, ভারত ও বাংলাদেশে প্রকাশিত বিভিন্ন হোমিওপ্যাথিক পত্রিকা ও স্মরণিকা
Tags: বাংলাদেশে হোমিওপ্যাথির ইতিহাসহোমিওডাইজেস্টহোমিওপ্যাথি

ডা. এ কে এম রুহুল আমিন