চেম্বার চিকিৎসক তৈরীর জন্য, শুধু রোগী দেখার জন্য নয়”

১৯৯৩ সাল নতুন চেম্বার শুরু করি, চেম্বার শুরু করার পর রোগী আসতে শুরু করলো, রোগীর সাথে কথা বলি, রোগীলিপি করি কিন্তু ঔষধ বাছাই করতে পারছিনা। তখন বিভিন্ন ডাক্তারের কাছে শেখার জন্য যেতে শুরু করলাম। তখন অনেক দূরে দূরে ডাক্তারের সাথে দেখা করার জন্য যেতাম। যেয়েতো লাভ হতো না, কেন জানেন! বন্ধ দরজা, চেম্বারের নয় ডাক্তারের মনের। ঘণ্টা পর ঘণ্টা বসে থাকতাম, অপেক্ষা করতাম ডাক্তার সাহেব রোগী দেখা শেষ করে হয়তো আমাকে ডাকবেন দু’একটি উপদেশ দিবেন; যা দিয়ে নিজের নতুনত্তের কষ্ট থেকে মুক্তি পাব, কিন্তু সে আশায় গুড়েবালি। কারণ ডাক্তার সাহেব রোগীদেখা শেষ করে ফোনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বন্ধুদের সাথে কথা বলতে থাকতেন, আর তখন আমার বুকে যে রক্তক্ষরণ হচ্ছিল তা বৃদ্ধি পেতো, যখন আমার সম্মুখ দিয়ে ডাক্তার চলে যেতেন আর বলতেন- “অন্য সময় এসো, কথা বলবো এখন সময় নেই চলে যাচ্ছি”।
না পাওয়ার কথা অনেক আছে, তা বললে অনেক বলা যাবে, কিন্তু যা পেয়েছি তা জানাতে চাই। ১৯৮৮ সাল থেকে একজন ডাক্তারের কাছে যেতাম, কোন দিন বলতেন না ফারুকী এই ভাবে রোগীলিপি কর বা এভাবে রেপার্টরি পড়তে হয়। তিনি ভাল রেপার্টরি জানতেন এবং ভাল রোগীলিপিও করতেন, রোগীদের সুস্থ্যতার সংখ্যাও বেশ ভাল। ১৯৯৩ সাল নিজের চেম্বারে রোগী দেখতে শুরু করলাম, তখন একজন রোগীর রোগীলিপি করে সেই ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলাম, ওনাকে বললাম (—-) ডাক্তার ভাই আমার রোগীলিপিটি দেখে একটি ঔষুধ বলে দেন না।
তিনি আমার লিখা রোগীলিপিটি পড়লেন এবং সঙ্গে সঙ্গে ওনার বিপরীতে আমি বসা ছিলাম সেই দিকে জোরে ছুড়ে দিলেন, রোগীলিপি খাতাটি জোরে ধাক্কার ফলে আমার দিকে সোজা না এসে একটু বাঁকা ভাবে আসার ফলে খাতাটি মেঝেতে পড়ে যায়। আমার মনে অনেক কষ্ট কিন্তু মুখের হাঁসি ছাড়িনি, মুখে হাঁসি রেখে খাতাটি আমার সেই পছন্দের কলেজ ব্যাগটিতে ঢুকিয়ে নিলাম। তারপর কিছু সময় দুই জনের পারিবারিক কথাবার্তা বলে চলে এলাম।
এবার ভাবতে থাকলাম কোথায় যাব কিভাবে রোগীলিপি শিখবো। সে সময় মনে অনেক কষ্ট, ডাক্তার আমার রোগীলিপি খাতাটি টেবিল থেকে ফেলে দিয়েছিল। এবার নিজেই কাছে থাকা বাংলা কেন্ট রেপার্টরি নিয়ে কাজ শুরু করি, কি করে রোগীলিপি করা যায়। সেই দিন সেই ডাক্তার যদি আমার রোগীলিপির খাতাটি টেবিল থেকে না ফেলে দিতেন আজ যতটুকুই রোগীলিপি করছি তা হয়তো বা নাও হতে পারতো।
যদিও এখন পর্যন্ত ভাল রোগীলিপি করতে পারিনি, তবে যতটুকুই করছি তাতে আমি নিজে তুষ্ট। তবে মনে যেনো কি একটি অভাব বা অতৃপ্তি রয়েছে। সে দিন যদি সেই ডাক্তার একটু রোগীলিপি শিখাতেন তাহলে সেই দিন আমার কত যে উপকার হতো তা ভাবছি।
সে দিন আমার পরিচিত ডাক্তার যদি একটু রেপার্টরি, একটু রোগীলিপি শেখাতেন তাহলে ওনার কি ক্ষতি হয়ে যেতো, তা আমি আজো ভেবে কোন কারণ খুঁজে পাচ্ছিনা।
আমার এই পরিচিত ডাক্তারের আচরণ আমাকে একটি কথাই ভাবাচ্ছিল যে, গত ২৩০বছরের হোমিওপ্যাথির উন্নতি হয়ত বা এই জন্যই হচ্ছিল না বা বড় বড় ডাক্তার তৈরি হচ্ছিল না। কারণ একজন ডাক্তার স্ব প্রচেষ্টায় তৈরি হতে পারে কিন্তু সে ক্ষেত্রে অনেক সময় লেগে যায়। এর মধ্যে অনেকেই তৈরি হতে পারে না। যদি অন্যের সহযোগিতা না থাকে।
হোমিওপ্যাথির গত ২৩০বছরের দিকে যদি তাকাই তাহলে দেখতে পাব সারা পৃথিবীতে অনেক বড় বড় ডাক্তার তৈরি হয়েছিলেন কিন্তু প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই তাদের মৃত্যুর পর আর সেখানে সমমানের ডাক্তার ছিল না, এমনকি এখনো নেই। আমরা যদি অন্য প্যাথির দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাব বর্তমান অবস্থায় যিনি শিক্ষকতা ও চিকিৎসা করছেন তাঁর ছাত্ররা তার চেয়ে অনেক বড় ডাক্তার হয়ে যাচ্ছেন। এতে শিক্ষকরা নিজেদেরকে অনেক গর্বিত মনে করেন, এমনকি ছাত্রদের উত্তরোত্তর উন্নতির জন্য অর্থনৈতিক ও মানসিক সকল প্রকার সাহায্য করে থাকেন। এর ফলে ছাত্ররা শিক্ষকদের চেয়েও অনেক বড় ডাক্তার হয়ে যাচ্ছেন। তাই সেই ডাক্তারের মৃত্যুর পর সেই প্যাথিতে যোগ্য ডাক্তারের অভাব হচ্ছে না। পক্ষান্তরে শুধুমাত্র আমাদের প্যাথিতেই (হোমিও) প্রতিষ্ঠিত বড় ডাক্তারের মৃত্যুর পর সেখানে তার সমমানের কোন ডাক্তার থাকে না। কারণ তিনি জীবদ্দশায় অন্য ডাক্তারদের সেভাবে তৈরি করেন নি।
আপনাদেরকে আমি আমার গ্রামের একটি পরিবারের কথা বলছি। আমার পাশের বাড়িতে একজন ম্যাজিস্ট্রেট আছে। ওনার বাবা ম্যাট্রিক পাশ করে একটি অফিসের পিয়ন পোস্টে চাকরি করেন। এই পিয়নের বাবা আমাদের এলাকায় নৌকা চালাতেন। তিনি কষ্ট করে, খেয়ে না খেয়ে ছেলেকে ম্যাট্রিক পাশ করিয়ে পিয়ন পোস্টে চাকরি দিলেন। এই পিয়ন অনেক কষ্ট করে ছেলেকে বি.সি.এস. করিয়ে ম্যাজিস্ট্রেট বানালেন। আজ এই পরিবার মাঝির পরিবার নয় ম্যাজিস্ট্রেটের পরিবার। পিয়ন বাবা নয় ম্যাজিস্ট্রেটের বাবা, মাঝি দাদা নয় ম্যাজিস্ট্রেটের দাদা। সেদিন যদি মাঝি দাদা ম্যাজিস্ট্রেটের বাবাকে পড়াশুনা না করিয়ে নৌকা চালানো শিখাতেন তাহলে আজকে এই ম্যাজিস্ট্রেট কোথা থেকে আসত?
এবার আমার জীবনের একটা গল্প বলি, আমি যখন সপ্তম শ্রেনিতে পড়ি আমার বাবা একদিন বাঁশ কাটার জন্য বাঁশঝাড়ে আমাকে সাথে নিয়ে যান। সেখানে গিয়ে দেখি পুরাতন বাঁশের ফাঁকে ফাঁকে অনেক নতুন বাঁশ রয়েছে যা একটু নাড়া লাগলেই ভেঙ্গে যায়। তখন বাবা অনেক সাবধানে সময় নিয়ে নতুন বাঁশগুলো অক্ষত রেখে পুরাতন বাঁশগুলো কাটছিলেন। তখন বাবাকে বললাম এই নতুন নরম বাঁশগুলো কেটে ফেলে আমাদের প্রয়োজন অনুসারে বাঁশ কেটে নিলেইতো পারি। তখন বাবা বললেন, এই নরম করুল বাঁশগুলো নষ্ট করে ফেললে পরবর্তীতে তোমার বাঁশঝাড়ে আর কোন বাঁশ পাবে না। এবং সেই সময় ধীরে ধীরে প্রয়োজনীয় বাঁশগুলো কাটলেন ও নরম করুল বাঁশগুলো যাতে নষ্ট না হয় সে ব্যবস্থা করলেন। এতে করে আমাদের বাঁশঝাড়ে সব সময় অনেক বাঁশ থাকে, কখনো বাঁশশূন্য হয় না।
যদিও আমরা প্রয়োজনে প্রতি বছর অনেক বাঁশ কেটে ফেলি। আমাদের বাঁশঝাড়ে বাঁশশূন্য হয় না কেন জানেন ? প্রতি বছর আমরা বাঁশঝাড়ে মাটি দেই, অপ্রয়োজনীয় মরা বাঁশগুলো কেটে ফেলি, বাঁশঝাড়ের করুল বাঁশগুলো বড় হতে সাহায্য করি। আমাদের এই যত্নের ফলে বাঁশঝাড় কখনো শূন্য হয় না। উত্তরোত্তর বাঁশঝাড় বৃদ্ধি পাচ্ছে, ভালো ভালো বাঁশ উৎপন্ন হচ্ছে। আর সেদিন যদি আমার ইচ্ছে মতো বাবা করুল বাঁশ নষ্ট করে ফেলতেন তাহলে অনেক আগেই বাঁশঝাড় বাঁশশূন্য হয়ে যেত।
তদ্রুপ যত্নের অভাবে গত ৩০ বছর পূর্বে আমাদের দেশে যত গুনী হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক ছিলেন তাদের অনেকের মৃত্যুর পর আর সেই মানের চিকিৎসক খুজে পাই না। পাব কি করে ? কারণ অতীতের গুনী চিকিৎসকগণ নিজেদের চেষ্টায় গুনী চিকিৎসক হয়ে ছিলেন। অন্যেরা চেষ্টা করেনি তাই গুনীদের মৃত্যুর পর সেরকম ডাক্তার পাচ্ছি না।
বর্তমানে আমাদের দেশ এবং পাশ্ববর্তী দেশ ভারতে যত হোমিওপ্যাথিক গুনী চিকিৎসক রয়েছেন তাঁদের অবর্তমানে আমরা যেন গুনী চিকিৎসক শূন্য না হই সেজন্য আমি আমার ডাক্তারদের বলি-
“তোমরা তোমাদেরকে গাব গাছ মনে করে তোমাদের চর্তুপাশে বটগাছের মত ডাক্তার তৈরি করবে”। তাহলে তোমাদের মৃত্যুর পর দেশ ও জনগণ তোমাদের স্মরন করবে, অভাব অনুভব করবে না। আর যদি তোমরা বড় ডাক্তার হও কিন্তু অন্যদের সহযোগিতা না করে বা তৈরি না করে মারা যাও তবে জাতি তোমাদের অভাব অনুভব করবে কিন্তু স্মরণ করবে না।
শুরুতেই লিখেছি “চেম্বার চিকিৎসক তৈরীর জন্য, শুধু রোগী দেখার জন্য নয়”। এই কথার প্রসঙ্গে একটি কথা বলছি আমরা যে যেই ধর্মের অনুসারী হই না কেন প্রত্যেকেই যার যার ধর্ম পালন করি। আপনারা যখন নিজের ঘরটি তৈরি করেন সেই সময় ঘরের চর্তুদিকে অনেক জানালা দিয়ে থাকেন। জানালা দেওয়ার সময় যদি ভাবেন ঘরের যে দিকে আপনার উপাসনালয় মসজিদ বা মন্দির যাই হোক না কেন তার শব্দ শুনার জন্য সেই পাশের জানালাটি এক ইঞ্চি বড় রাখলেন। উদ্দেশ্য হলো এই জানালাটি একটু বড় হলে মসজিদ বা মন্দিরের শব্দ ভালো শুনতে পাব। এর ফলে সৃষ্টিকর্তা আপনাকে পূণ্য দিবেন। এই জানালাটি এক ইঞ্চি বড় রাখা হলো শব্দ শুনার জন্য এতে করে কি বাতাস কম আসবে ? আপনি জানালা কাটার সময় এক ইঞ্চি বেশী রেখেছেন পূন্যের জন্য সাথে বাতাস ও পাচ্ছেন।
তদ্রুপ একজন চিকিৎসক যদি চেম্বার শুরু করার পূর্বে নিয়ত করেন আমি চেম্বার করবো ডাক্তার তৈরি করার জন্য, ডাক্তারদের বসার সুবিধার্থে চেম্বারের সামনের রুমটি একটু বড় রাখব। সব সময় নতুন ডাক্তারদের প্রশিক্ষণ দিতে থাকব, তাহলে এর মাঝেই সেই ডাক্তারের প্রয়োজনীয় টাকা পয়সা উপার্জন হয়ে যাবে।
আপনার কাছে যে সকল নতুন চিকিৎসক শিখতে আসবেন তারা আপনার চিকিৎসা পেশার জন্য বাঁধা হবে না বরং উপকার হবে। আপনি যখন আপনার সন্তানকে স্কুলে পাঠান সাথে দুপুরের খাবার দিয়ে দেন যাতে আপনার সন্তানের কষ্ট না হয়।এত মায়া কেন শুধু লালন পালন করেন এই জন্যই তো ? তাহলে যে সৃষ্টিকর্তা আপনাকে সৃষ্টি করেছেন তিনি কি আপনার প্রয়োজন অবগত নন ? তাহলে আপনার কিসের চিন্তা ? প্রতিজ্ঞা করুন নতুন ডাক্তারদের যে কোন ভাবে যতটুকু সম্ভব সহযোগিতা করবো। আমাদের দেশ ও পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে যত ডাক্তার হোমিওপ্যাথি ডিগ্রি নিচ্ছেন তাদের বেশি সংখ্যক অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন। তার কারণ কি জানেন ? তার একমাত্র কারণ হলো সিনিয়রদের কোন সহযোগিতা না পাওয়া।
গত কয়েকদিন আগে আমাকে এক দায়িত্বশীল ডাক্তার বলেছিলেন ডা. ফারুকী আপনি যে কাজটি করছেন তা প্রশংসনীয়, তবে ডি.এইচ.এম.এস পাশের আগে রোগীলিপি ও রেপার্টরি শিখালে হিতে বিপরীত হতে পারে। তিনি যা বুঝাতে চেয়েছিলেন তা হলো যদি কোন শিক্ষানবিস চিকিৎসক রোগীলিপি ও রেপার্টরি জানেন তাহলে তারা সহজেই চিকিৎসা দিতে শুরু করবে। তিনি একবারও ভেবে দেখেননি শুধুমাত্র রোগীলিপি ও রেপার্টরি না জানা ও সিনিয়রদের সহযোগিতা না পাওয়ার ফলে হোমিওপ্যাথিতে ডিগ্রি নেওয়ার পরও অধিকাংশ চিকিৎসক অন্য পেশায় চলে যায়।
সবশেষে আমার সকল ডাক্তারদের বলছি আপনারা প্রাইমারী শিক্ষক জে ডি.সি, এস.পি তৈরি করুন। তাহলে দেশ ও জাতির মঙ্গল হবে, পরকালে ও শান্তি পাবেন।
সকলের সুস্বাস্থ্য কামনা করে রাখলাম।

-ডা. আহাম্মদ হোসেন ফারুকী।