অর্গানন: সূত্র- ১৫০ থেকে ২০৩ পর্যন্ত।

সূত্রঃ ১৫০। কেবল স্বল্পকালে পূর্বে দেখা গিয়েছে এই রূপ এক বা একাধিক লক্ষণের কথা রোগী যদি বলে তাহা হইলে চিকিৎসার যোগ্য পূর্ণাঙ্গ ব্যাধি বলিয়া চিকিৎসকের তাহার উপর কোন গুরুত্ব আরোপ করিবার প্রয়োজন নাই । খাদ্যবস্হায় সামান্য কিছু পরিবর্তন করাই এরূপ অসুস্থতাকে দূরীভূত করিবার পক্ষে সাধারণত যথেষ্ট ।
সূত্রঃ ১৫১। কিন্তু রোগী যখন কোন প্রচণ্ড যন্ত্রণার অভিযোগ করে তখন চিকিৎসক অনুসন্ধান করিলে তাহা ছাড়া অপেক্ষাকৃত সামান্য ধরনের হইলেও আরও কতকগুলি লক্ষণ দেখিতে পাইবেন । সেগুলিকে লইয়া রোগের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যাইবে।
সূত্রঃ ১৫২। অচিররোগ যত বেশি গুরুতর হইবে তত বেশি সংখ্যক ও বিশেষ ধরনের লক্ষণ তাহাতে সাধারণত থাকিবে এবং তাহার জন্য তত সুনিশ্চিতভাবে একটি উপযুক্ত ঔষধ পাওয়া যাইবে যদি যথেষ্ট সংখ্যক ঔষধ– যাহাদের মধ্য হইতে তাহা বাছিয়া লইতে হইবে—-এবং তাহাদের সঠিক ক্রিয়া সম্বন্ধে জানা থাকে। বহুসংখ্যক ঔষধের লক্ষণ তালিকা হইতে এমন একটি ঔষধ পাওয়া কঠিন হইবে না যাহার আরোগ্যদায়ক কৃত্তিম বিশেষ রোগ উপাদানসমূহ হইতে প্রাকৃতিক পীড়ার লক্ষণ সমষ্টির সদৃশ একটি চিত্র অংকন করা যায় । এই ঔষধই ঈপ্সিত আরোগ্যদায়ক ঔষধ ।
সূত্রঃ ১৫৩। নির্দিষ্ট আরাগ্যদায়ক হোমিওপ্যাথিক ওষুধের এই অনুসন্ধানে অর্থাৎ প্রাকৃতিক রোগের লক্ষণ সমষ্টির সহিত পরিচিত ঔষধ সমূহের তালিকা মিলাইয়াএকটি কৃত্রিম রোগ শক্তি বাহির করিতে রোগীর অধিকার উল্লেখযোগ্য, অনন্য, অসাধারণ, এবং বিচিত্র (পরিচায়ক) চিহ্ন ও লক্ষণাবলী দিকে কেবলমাত্র লক্ষ রাখিতে হইবে। কারণ আরোগ্য কল্পে সর্বাধিক উপযুক্ত হইতে হইলে বিশেষ করিয়া এইগুলির সহিত নির্বাচিত ঔষধের লক্ষণসমূহের খুব বেশি সাদৃশ্য থাকা চাই। অধিকতর সাধারণ ও অস্পষ্ট লক্ষণসমূহ যেমন, অক্ষুধা, মাথাধরা, দুর্বলতা, নিদ্রায় অস্থিরতা, অস্বস্তি প্রভৃতি যতক্ষণ অস্পষ্ট ও অনির্দিষ্ট থাকে এবং ঠিকমতো বর্ণনা করা না হয় ততক্ষণ সে গুলির দিকে লক্ষ্য দিবার প্রয়োজন অতি অল্প। কারণ এই প্রকার সাধারণ ধরনের লক্ষণ প্রায় প্রত্যেকটি রোগেই দেখা যায় এবং প্রায় প্রত্যেকটি ঔষধেই পাওয়া যায়।
সূত্রঃ ১৫৪। যোগ্যতম ঔষধের লক্ষণ তালিকা হইতে যে প্রতিরূপ প্রস্তুত করা হয় তাহার মধ্যে যদি সে সকল বিচিত্র, অসাধারণ, অনন্য এবং বিশিষ্ট (পরিচালক) লক্ষণসমূহ বিদ্যমান থাকে যেগুলি অধিকতম সংখ্যায় ও অধিকতম সাদৃশ্যসহ যে রোগ চিকিৎসা করিতে হইবে তাহার মধ্যে দেখা যায়, তাহা হইলে সেই ঔষধই হইবে সেই রোগে সর্বাপেক্ষা উপযুক্ত আরোগ্যদায়ক হোমিওপ্যাথিক ঔষধ। রোগ যদি খুব বেশি পুরাতন না হয় তাহা হইলে সাধারণত প্রথম মাত্রাতেই বেশি কিছু ভুল যোগ ব্যতীত দূরীভূত ও বিনষ্ট হইবে ।
সূত্রঃ ১৫৫। আমি বলিতেছি, বেশি কিছু গোলযোগ ব্যতীত। কারণ এই যোগ্যতম ওষুধের প্রয়োগ ক্ষেত্রে ওষুধের সেই সকল লক্ষণই ক্রিয়াশীল হয় যেগুলির সহিত ও রোগলক্ষণের মিল আছে। দেহাভ্যন্তরে অর্থাৎ জীবনীশক্তির অনুভূতির ক্ষেত্রে প্রথমোক্ত লক্ষণসমূহ শেষোক্তগুলির (দুর্বলতার) স্থান অধিকার করিয়া ধ্বংস করিয়া ফেলে। কিন্তু হোমিওপ্যাথিক ঔষধের অন্যান্ন লক্ষন, যেগুলি সংখ্যায় প্রায় খুব বেশি, সেই রোগের সহিত কোন প্রকার সম্পর্ক থাকে না বলিয়া আদৌ কার্যকরী হয় না । রোগী প্রতি ঘন্টায় ক্রমশ বোধ করিতে থাকে, সেইজন্য সেগুলি সম্বন্ধে সে প্রায়ই আর কিছু অনুভব করে না কারণ, হোমিওপ্যাথি মতে ব্যবহৃত ঔষধের অত্যন্ত ক্ষুদ্র মাত্রা এত মৃদু যে রোগের সদৃশ নহে এরূপ অন্যান্য লক্ষণ দেহের রোগ মুক্ত স্থানসমূহে উৎপাদন করিতে পারে না এবং সেইজন্য দেহের যে সকল স্হান রোগের সদৃশ লক্ষণ দ্বারা সর্বাধিক আক্রান্ত ও উত্তেজনাগ্রস্ত হইয়া পড়িয়াছে সেই সকল স্থানেই হোমিওপ্যাথিক লক্ষণসমূহ ক্রিয়া প্রকাশ করিতে সমর্থ হয়। তাহার ফলে রুগ্ন জীবনীশক্তি সদৃশ অথচ বলবত্তর ঔষধ জনিত পীড়ার বিরুদ্ধেই মাত্র প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করিতে সমর্থ হয় এবং তদ্বারা মুলব্যাধি বিনষ্ট হয় ।
সূত্রঃ ১৫৬। এমন কোন হোমিওপ্যাথিক ঔষধ নাই বলিলেই হয় যাহা সুনির্বাচিত হইলেও বিশেষভাবে উপযুক্ত সূক্ষ্ম মাত্রায় প্রযুক্ত না হইলে অত্যন্ত উত্তেজনা ও অনুভূতিপ্রবণ রোগীর ক্ষেত্রে, যতক্ষণ তাহার ক্রিয়া বর্তমান থাকে, অনন্ত একটি সামান্য অস্বভাবিক বিশৃংখলা, কিছু নগণ্য নুন্যতন লক্ষণ উৎপাদন না করে। কারণ ইহা এক প্রকার অসম্ভব যে সমবাহু ও সমকোণ বিশিষ্ট দুইটি ত্রিভুজের মত ঔষধ ও রোগ, লক্ষণের দিক দিয়া, ঠিক একইভাবে পরস্পর মিলিয়া যাইবে। সাধারণ ক্ষেত্রে এই যে তুচ্ছ প্রভেদ তাহা জীবন্ত দেহের প্রচ্ছন্ন ক্রিয়া (শক্তি) দ্বারা সহজেই দূরীভূত হইবে এবং অত্যন্ত দুর্বল না হইলে রোগী তাহা অনুভবই করে না। দেহের উপর বিভিন্ন প্রকার ঔষধের ক্রিয়া, আহারাদির ভুল কিংবা মানসিক উত্তেজনা দ্বারা যদি বাঁধা না পায় তাহা হইলে স্বাস্থ্য উন্নতির পথে চলিতে চলিতে সম্পূর্ণ আরোগ্য পৌঁছায়।
সূত্রঃ ১৫৭। কিন্তু যদিও ইহা নিশ্চিত যে হোমিওপ্যাথি মতে নির্বাচিত ঔষধ উপযুক্ততা এবং মাত্রায় সূক্ষ্মতার জন্য তাহার সদৃশ অচিররোগকে শান্তভাবে এবং অন্য কোন বিসদৃশ লক্ষণ প্রকাশ না করিয়া অর্থাৎ নতুন কোনো গুরুতর বিশৃঙ্খলা না আনিয়া দূরীভূত ও বিনষ্ট করে, তথাপি মাত্রা যথোচিত ক্ষুদ্র না হইলে এবং যেখানে কয়েক ঘন্টা ধরিয়া মাত্রা কিছু অধিক পরিমাণে দেওয়া হইয়াছে সেখানে প্রায়ই ঔষধ সেবনের অব্যবহিত পরেই প্রথম ঘন্টা কিংবা কয়েক ঘণ্টার জন্য রোগের সামান্য একটা বুদ্ধি দেখা যায় এবং তাহা মূল রোগের এত সদৃশ যে রোগীর কাছে মনে হয় তাহার নিজস্ব রোগেরই বৃদ্ধি হয়েছে। কিন্তু তাহা প্রকৃতপক্ষে রোগ অপেক্ষা কিছু বেশি শক্তিশালী অত্যন্ত সদৃশ ওষুধ জনিত রোগ ছাড়া আর কিছুই নহে।
সূত্রঃ ১৫৮। প্রথম কয়েক ঘণ্টার এই সামান্য হোমিওপ্যাথিক বৃদ্ধি (যাহা অচিররোগ প্রথম মাত্রাতেই প্রশমিত হইবার প্রায় নিশ্চিত নিদর্শন) ঠিক যে রূপ হওয়া উচিত কারণ একটি প্রাকৃতিক বেঁধে অধিকতর শক্তিশালী হলে যেমন অপর একটি সদৃশ ব্যাধিকে দূরীভূত অভি নষ্ট করে (সূত্র ৪৩-৪৮) সেইরূপ যে ব্যাধিকে নিরাময় করিতে হইবে তাহাকে পরাভূত ও ধ্বংস করিতে হইলে ঔষধজ ব্যাধিকে স্বভাবতই বেশি শক্তিশালী হইতে হইবে।
সূত্রঃ ১৫৯। অচিররোগের চিকিৎসায় হোমিওপ্যাথিক ঔষধের মাত্রা যত ক্ষুদ্র হইবে ব্যাধির প্রথম কয়েক ঘণ্টার এই প্রতীয়মান বৃদ্ধিও ক্ষণস্থায়ী হইবে।
সূত্রঃ ১৬০। কিন্তু যেহেতু হোমিওপ্যাথিক ঔষধের মাত্রা কে এত ক্ষুদ্র করা যায় না যাহা সামান্য পুরাতন, জটিলতা শূন্য, সদৃশ প্রাকৃতিক ব্যাধিকে প্রশমিত, পরাভূত এমনকি সম্পূর্ণরূপে নিরাময় ও বিনষ্ট করিতে পারে না, সেই হেতু আমরা বুঝতে পারি যে ঠিক মতো নির্বাচিত হোমিওপ্যাথিক ঔষধ, তাহার মাত্রা যদি একেবারে ক্ষুদ্র না হয় তাহা হইলে তাহা সেবনের পরে কেন প্রথম ঘণ্টায় অনুভব যোগ্য এই প্রকার হোমিওপ্যাথিক বৃদ্ধি সর্বদাই আনয়ন করে।
সূত্রঃ ১৬১। প্রথম ঘণ্টায় বা কেবল প্রথম কয়েক ঘণ্টায় তথাকথিত হোমিওপ্যাথিক বৃদ্ধি অর্থাৎ হোমিওপ্যাথিক ঔষধের প্রাথমিক ক্রিয়াহেতু মূলরোগের কিছু বৃদ্ধির যে কথা আমি বলেছি অচিররোগ যাহা সম্প্রতি হইয়াছে তাহা সম্বন্ধে সত্য। কিন্তু যেখানে দীর্ঘ প্রিয় ঔষধ সমূহকে বহুদিনের পুরাতন যুগের সহিত লড়াই করতে হয় সেখানে চিকিৎসাকালে মূলরোগের এই রোগ বৃদ্ধি ঘটা উচিত নহে এবং তাহা ঘটে না যদি সুনিশ্চিত ঔষধ যথোচিত ক্ষুদ্র মাত্রায় প্রত্যেকবার কিঞ্চিৎ উচ্চতর নূতন শক্তিতে পরিবর্তিত করিয়া দেওয়া হয়। চির রোগের মূল লক্ষণসমূহের এই প্রকার বৃদ্ধি চিকিৎসার শেষ ভাগে, যখন আরোগ্য প্রায় আসন্ন কিংবা তাহা সম্পূর্ণ সাধিত হইয়াছে তখনই কেবল হইতে পারে।
সূত্রঃ ১৬২। পরিমিত সংখ্যক ওষুধেরই যথার্থ বিশুদ্ধ ক্রিয়া এযাবৎ জানা গিয়াছে বলিয়া কখনও কখনও চিকিৎসাধীন পীড়ার লক্ষণসমূহের অংশমাত্র সুনির্বাচিত ঔষধের লক্ষণ তালিকার মধ্যে দেখা যায়। সেই জন্য অধিকতর উপযুক্ত ঔষধের অভাবে এই অসম্পূর্ণভাবে পীড়া উৎপাদক ঔষধকেই প্রয়োগ করা হয়।
সূত্রঃ ১৬৩। এই ক্ষেত্রে ঔষধ হইতে আমরা পূর্ণাঙ্গ উপদ্রবহীন আরোগ্য লাভ বস্তুত আশা করিতে পারি না। কারণ ঔষধের ব্যবহারকালে এমন কতকগুলি লক্ষণ আসিয়া উপস্থিত হয় যেগুলিকে পূর্বে ঐ রোগে দেখা যায় নাই। সেইগুলি হইল ঔষধের অনুপযুক্ততা হেতু অতিরিক্ত লক্ষণ (accessory symptoms)। ইহা কিন্তু রোগের অনেকখানি অংশ (রোগলক্ষণের সহিত ঔষুধ লক্ষণের যতখানি মিল আছে) নির্মল করিয়া আরোগ্য সূচনা করিবার কোন বাধা হয়না। তথাপি ঐসকল অতিরিক্ত লক্ষণ বাদ দিয়া তাহা ঘটে না। অবশ্য ওষুধের মাত্রা যথেষ্ট পরিমাণে অল্প থাকিলে ঐসকল লক্ষণ পরিমিত ভাবেই দেখা যায়।
সূত্রঃ ১৬৪। সর্বোত্তম সুনির্বাচিত ঔষধের মধ্যে কয়েকটি মাত্র সাদৃশ্য থাকলেও তাহা আরোগ্যের পথে বাধা হয় না যদি ঔষধের সেই কয়েকটি লক্ষণ প্রধানত রোগের অসাধারণ এবং অদ্ভুত ধরনের বৈশিষ্ট্য নির্দেশক (পরিচয়জ্ঞাপক) লক্ষণ হয় । এরূপ ক্ষেত্রে বিশেষ কোন উপদ্রব ছাড়াই আরোগ্য হয় ।
সূত্রঃ ১৬৫। কিন্তু যদি নির্বাচিত ঔষধের লক্ষণ সমূহের মধ্যে এমন কোন লক্ষণ না থাকে যাহা সঠিকভাবে রোগের বিশেষ, অদ্ভুত ও অসাধারণ লক্ষণ সমূহের সদৃশ, যদি কেবলমাত্র রোগের সাধারণ, অস্পষ্ট ভাবে বর্ণিত অনিশ্চিত অবস্থাগুলির (বমনভাব, দুর্বলতা, মাথাব্যথা প্রভৃতি) সহিতই ঔষধটি মিল থাকে এবং যদি পরিচিত ঔষধ সমূহের মধ্যে সেটি অপেক্ষা আর কোন সদৃশ লক্ষণ বিশিষ্ট উপযুক্ত ঔষধ না পাওয়া যায়, তাহা হইলে চিকিৎসক এই প্রকার অসদৃশ্ ঔষধ প্রয়োগ দ্বারা কোন আশু সুফল প্রাপ্তির প্রতিশ্রুতি দিতে পারেন না।
সূত্রঃ ১৬৬। এইরূপ ক্ষেত্র কিন্তু খুবই বিরল। কারণ অধিক সংখ্যক ঔষধের যথার্থ ক্রিয়ার সহিত পরিচয় এখন আমাদের হইয়াছে এবং ঔষধ জনিত কুফল যদি দেখা যায় তাহা হইলে পরবর্তী অধিকতর সদৃশ ঔষধের নির্বাচন দ্বারা তখনই তাহা হ্রাস করা যায়।
সূত্রঃ ১৬৭। এইভাবে অনুপযুক্ত হোমিওপ্যাথিক ঔষধ প্রথম প্রয়োগ করিয়া যদি ধর্তব্য কিছু অতিরিক্ত লক্ষণ আসিয়া উপস্থিত হয় তাহা হইলে অচিররোগের ক্ষেত্রে প্রথম মাত্রায় ক্রিয়া শেষ করিতে দিই না বা ওষুধের পূর্ণ ক্রিয়া রোগীকে ভোগ করিতে দিই না বরং পরিবর্তিত অবস্থায় নতুনভাবে আমরা রোগ সম্বন্ধে অনুসন্ধান করি এবং রোগের নতুন চিত্র অঙ্কনের জন্য সাম্প্রতিক লক্ষণগুলির সহিত আদি লক্ষণ সমূহের অবশিষ্টগুলি যোগ করে লই ।
সূত্রঃ ১৬৮। আমরা তখন আরও অধিক ক্ষিপ্রতার সহিত পরিচিত ঔষধ সমূহের মধ্য হইতে আমাদের চিকিৎসাধীন পীড়ার সদৃশ এমন একটি ঔষধ বাহির করিতে পারিব যাহার একমাত্র রোগকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস না করিলেও আরোগ্য পথে অনেক আগাইয়া লইয়া যাইবে। এই ঔষধ ও যদি স্বাস্থ্যোদ্ধারের পক্ষে যথেষ্ট না হয় তখন রুগ্নাবস্বায় যেটুকু অবশিষ্ট থাকবে তাহা বারবার পরীক্ষা করিয়া এবং তজ্জন্য যতসম্ভব উপযুক্ত হোমিওপ্যাথিক ঔষধ নির্বাচন করিয়া যে পর্যন্ত আমাদের উদ্দেশ্য অর্থাৎ রোগীর সম্পূর্ণ স্বাস্হ্যলাভ সাধিত না হয় সেই পর্যন্ত এই ভাবে আমরা চলিত থাকিব।
সূত্রঃ ১৬৯। প্রথম রোগ পরীক্ষা এবং প্রথম ঔষধ নির্বাচন করিতে গিয়া যদি আমরা দেখি যে যথেষ্ট সংখ্যক ঔষধের সহিত পরিচয় না থাকাহেতু একটিমাত্র ওষুধের পীড়া উৎপাদনের ভিতরে রোগের সমগ্র লক্ষণ সমষ্টি ধরা পড়িতেছে না, উপযুক্ততার দিক দিয়া দুইটি ঔষধ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করিতেছে, রোগলক্ষণের একাংশের জন্য একটিকে এবং অপরঅংশের জন্য অপরটিকে উপযুক্ত বলিয়া মনে হইতেছে, তখন সেই দুইটির মধ্যে অধিকতর উপযুক্ত ওষুধটিকে প্রয়োগ করিবার পর রোগীকে পুনরায় পরীক্ষা না করিয়া দ্বিতীয়টিকে প্রয়োগ করা কর্তব্য নহে, দুইটিকে একসঙ্গে দেওয়া আরও অনুচিত (টীকা ২৭২ সূত্র) । কারণ যেঔষধ টিকে প্রথমটির পরেই যোগ্যতর বলিয়া মনে হইয়াছিল ইতিমধ্যে অবস্থার পরিবর্তন হওয়ায় তাহা অবশিষ্ট লক্ষণসমূহের জন্য আর দরকার নাও হইতে পারে। অতএব সে ক্ষেত্রে নূতনভাবে পরীক্ষায় যে লক্ষণ সমষ্টি দেখা যাইবে তজ্জন্য দ্বিতীয় ঔষধটির স্থানে একটি যোগ্যতার সদৃশ ওষুধ নির্বাচন করা প্রয়োজন হইবে।
সূত্রঃ ১৭০। অতএব প্রত্যেক ক্ষেত্রে, যেমন এই ক্ষেত্রে, রোগাবস্তার পরিবর্তন ঘটলে তখনকার অবশিষ্ট লক্ষণগুলি সম্বন্ধে অনুসন্ধান করিতে হইবে এবং যে ঔষধটিকে পরবর্তী উপযুক্ত ঔষধ বলিয়া মনে হইয়াছিল সেটির দিকে ঝোঁক না দিয়া অন্য একটি হোমিওপ্যাথিক ঔষধ—যাহা উপস্হিত ক্ষেত্রে যথাসম্ভব উপযোগী তাহা নির্বাচন করিতে হইবে। এইরূপ যদি হয়, যদিও তারা প্রায়ই ঘটে না, যে ওষুধটিকে প্রথমে পরবর্তী উপযুক্ত ঔষধ বলিয়া মনে হইয়াছিল তাহা তখন ও অবশিষ্ট রুগ্নাবস্থায় জন্য উপযোগী, তাহা হইলে তাহা আমাদের কাছে আরও নির্ভরযোগ্য এবং অন্য ঔষধ না দিয়া সেইটিকে তখন প্রয়োগ করাই যুক্তিযুক্ত।
সূত্রঃ ১৭১। অযৌন চিররোগ অর্থাৎ যে সকল রোগ খুব সাধারণভাবে সোরা হইতে উৎপন্ন সেই সকল ক্ষেত্রে আরোগ্যের জন্য প্রায়ই আমাদিগকে পরপর কতকগুলি সোরাদোষঘ্ন ঔষধ প্রয়োগ করিতে হয়। পূর্ববর্তী ঔষধটির ক্রিয়া শেষ হইবার পর যে সকল লক্ষণ অবশিষ্ট থাকে তাহার সহিত সদৃশ্য মিলাইয়া আবার পরবর্তী ঔষধ নির্বাচন করা হয়।
সূত্রঃ ১৭২। রোগ লক্ষণের অত্যন্ত স্বল্পতা হেতু আরোগ্যের পথে অনুরূপ অসুবিধা ঘটিয়া থাকে। ইহা এমন একটি অন্তরায় যাহা আমাদের বিশেষ মনোযোগের বিষয় । কারণ ইহা দূরীভূত হইলে সম্ভাব্য চিকিৎসাপদ্ধতি সমূহের মধ্যে সর্বাপেক্ষা পূর্ণাঙ্গ এই চিকিৎসা প্রণালী ( যেখানে ইহার যন্ত্র স্বরূপ পরিচিতি হোমিওপ্যাথিক ঔষধ এখনও অসম্পূর্ণ সে ক্ষেত্র ছাড়া) পথে অবস্থিত সকল অন্তরায় দূরীভূত হইবে।
সূত্রঃ ১৭৩। সেই সকল রোগ, যাহাতে লক্ষণ খুব কমই দেখা যায় এবং সেইজন্য দুশ্চিকিৎস্য তাহাকে একতরফা ব্যাধি (one-sided diseases) বলা হয়। ঐ সকল রোগে মাত্র দুই একটি প্রধান লক্ষণ দেখা গেলেও বাকি লক্ষণগুলি ঢাকা থাকে । সেইগুলি প্রধানত চিররোগের পর্যায়ভুক্ত ।
সূত্রঃ ১৭৪। তাহাদের প্রধান লক্ষণ হয়তো কোন একটি অভ্যন্তরীণ উপসর্গ লইয়া ( যেমন, বহু বৎসরের মাথাধরা, অনেকদিনের উদরাময়, পুরাতন হৃদশূল প্রভৃতি), আর নয়তো বহিরাঙ্গিক কোন পীড়া ।শেষোক্ত পীড়া কে সাধারণত স্থানীয় ব্যাধি (local maladies) নামে চিহ্নিত করা হয় ।
সূত্রঃ ১৭৫। প্রথম প্রকারের একতরফা যে রোগ তাহার মূলে হইল চিকিৎসকের অন্তর্দৃষ্টির অভাব এবং যে সকল লক্ষণ প্রকৃতই রহিয়াছে এবং যেগুলির সাহায্যে তাঁহার পক্ষে রোগের পূর্ণাঙ্গ চিত্র অঙ্কন করা সম্ভব সেগুলিকে সম্পূর্ণভাবে আবিষ্কার করিতে না পারা।
সূত্রঃ ১৭৬। তথাপি অল্প সংখ্যক এমন কয়েকটি রোগ আছে যেগুলি খুব সযত্ন প্রাথমিক পরীক্ষার অন্তে (সূত্র ৮৪-৯৮) মাত্র দুই একটি তীব্র প্রচন্ড লক্ষণ দেখা যায়; বাকিগুলি অস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়।
সূত্রঃ ১৭৭। এরূপ ক্ষেত্র যদিও খুব বিরল তথাপি খুব সফলতার সহিত ইহার চিকিৎসা করিতে হইলে আমাদিগকে প্রথমত সেই কয়েকটি লক্ষণ ধরিয়া সেই ওষুধটি নির্বাচন করিতে হইবে যেটি আমাদের বিবেচনায় সর্বাপেক্ষা সদৃশ।
সূত্রঃ ১৭৮। ইহারা নিঃসন্দেহে কখনও কখনও এ রূপ ঘটে যে, ঠিক হোমিওপ্যাথিক নিয়মে নির্বাচিত সেই ওষুধটি বর্তমান রূপটি কে ধ্বংস করিবার উপযোগী একটি সদৃশ কৃত্রিম রোগ যোগাইয়া দিতে পারে। এইরূপ ঘটা আরও সম্ভবপর হয় যখন এই প্রকার স্বল্প কয়েকটি পীড়ার লক্ষণ স্পষ্ট, নিশ্চিত, অসাধারণ এবং যথাযথ পরিচয়জ্ঞাপক হয় ।

সূত্রঃ ১৮০। এই স্তরে যথাসম্ভব সঠিক ভাবে নির্বাচিত, কিন্তু উল্লেখিত কারণে অসম্পূর্ণভাবে সদৃশ ঔষধ তাহার আংশিক সদৃশ রোগের উপায় ক্রিয়ায়—যেমন উল্লিখিত ক্ষেত্রে (সূত্র ১৬২ ও অন্যান্য) যেখানে হোমিওপ্যাথিক ঔষধের সংখ্যা সীমাবদ্ধ বলিয়া পূর্ণাঙ্গ নির্বাচন সম্ভব হয় না— অতিরিক্ত লক্ষণ প্রদান করে এবং নিজ লক্ষণ শ্রেণী হইতে উদ্ভূত কয়েকটি অবস্থা রোগীর অবস্থার সহিত যুক্ত হয়। সেইগুলি কিন্তু রোগেরই নিজস্ব লক্ষণ, যদিও ইতোপূর্বে সেগুলি কদাচিৎ দেখা গিয়েছে একেবারেই প্রতীয়মান হয় নাই। কতকগুলি লক্ষণ দেখা দেয় যেগুলি রোগী পূর্বে কখনো অনুভব করে নাই কিংবা অপর কতকগুলি যাহা কেবল অস্পষ্টভাবে অনুভূত হইয়াছিল তাহা অধিকতর স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
সূত্রঃ ১৮১। ঐ অতিরিক্ত এবং রোগের সদ্যপ্রকাশিত নতুন লক্ষণাবলী সেই ঔষধ প্রয়োগের ফলে ঘটিয়েছে এই রূপ ধরিয়া লইলে আপত্তির কিছু নাই। সেইগুলি যে ঔষধ হইতে উদ্ভূত তাহা নিশ্চিত। কিন্তু সেইগুলি সর্বদা সেই প্রকারেরই লক্ষণ যাহা সেই রোগ নিজে সেই দেহে উৎপাদন করতে পারে এবং প্রযুক্ত ওষুধের সদৃশ লক্ষণ উৎপন্ন করিবার ক্ষমতা আছে বলিয়া তাঁহার সেই সকল লক্ষণকে আনিয়া তাহাদিগকে প্রকাশিত হতে বাধ্য করে। এক কথায়, অধুনা প্রতীয়মান সমগ্র লক্ষণ সমষ্টিকে রোগেরই নিজস্ব এবং তাহাকে তৎকালীন বাস্তব অবস্থা বলিয়া ধরিয়া লইয়া তদনুসারে আমাদের পরবর্তী চিকিৎসা পরিচালিত করিতে হইবে।
সূত্রঃ ১৮২। ঔষধের অসম্পূর্ণ নির্বাচন—যাহা এই ক্ষেত্রে লক্ষণের স্বল্পতা হেতু তাই অবশ্যম্ভাবী—এইরূপে রোগ লক্ষণের পূর্ণ প্রকাশে সহায়তা করে এবং এই উপায় ও অধিকতর উপযুক্ত দ্বিতীয় হোমিওপ্যাথিক ওষুধের আবিষ্কার সহজ করিয়া দেয় ।
সূত্রঃ ১৮৩। সেই জন্য যখনই প্রথম ঔষধের মাত্রা আর কাজ না করে (যদি নুতন আবির্ভূত লক্ষণসমূহ এর গুরুত্ব হেতু দ্রুত সাহায্যের প্রয়োজন না হয় যাহা হোমিওপ্যাথিক ঔষধের অতি ক্ষুদ্র মাত্রার জন্য এবং সুদীর্ঘ একান্ত বিরল) তখনই আবার নূতন করিয়া রোগ পরীক্ষা করিয়া তখনকার রোগের অবস্থা লিপিবদ্ধ করিতে হইবে এবং তদনুসারে একটি দ্বিতীয় হোমিওপ্যাথিক ঔষধ, যাহা তখনকার অবস্থার ঠিক উপযুক্ত, নির্বাচন করিতে হইবে। এই অবস্থায় লক্ষণসমূহ সংখ্যাই অধিক এবং পূর্ণাঙ্গ হওয়ায় অধিকতর উপযোগী ঔষধ তখন পাওয়া যায়।
সূত্রঃ ১৮৪। এইরূপ ভাবে ঔষধের প্রত্যেকটি নতুন মাত্রার ক্রিয়া শেষ হইলে যখন তাহার উপযোগিতা ও উপকারিতা আর থাকে না, তখন রোগের বাকি অবস্থার অবশিষ্ট লক্ষণগুলি আবার নূতন করিয়া লিখিতে হইবে এবং তখনকার প্রতীয়মান লক্ষণগুলি এর জন্য যতদূর সম্ভব উপযোগী আরেকটি হোমিওপ্যাথিক ঔষধ অনুসন্ধান করিতে হইবে। যতদিন আরোগ্য সম্পূর্ণ না হয় ততদিন এই ভাবে চলিতে হইবে।
সূত্রঃ ১৮৫। একতরফা ব্যাধিসমূহের মধ্যে তথাকথিত স্থানীয় ব্যাধিগুলি একটি প্রধান স্থান অধিকার করে আছে; যে সকল পরিবর্তন এবং পীড়া দেহের বহির্ভাগে দেখা যায় সেই গুলিকে এই আখ্যা দেওয়া হয়। এই পর্যন্ত শিক্ষালয় এই ধারণাই চলিয়া আসিতেছে যে, এই সকল অংশই কেবল পীড়িত, দেহের বাকি অংশের সহিত পীড়ার কোন যোগ নাই। অনুমানসাপেক্ষ এই অসঙ্গত মতবাদ অত্যন্ত বিপজ্জনক চিকিৎসা পদ্ধতির প্রবর্তন করিয়াছে।
সূত্রঃ ১৮৬। তথাকথিত ঐ সকল স্থানীয় ব্যাধি যেগুলি কিছুকাল আগে মাত্র বাহ্যক্ষত হইতে উৎপন্ন হইয়াছে সেই গুলিকে তবুও প্রথম দিষ্টিতে স্হানীয় ব্যাধি নাম দেওয়া চলে। সেই ক্ষেত্রে কিন্তু ঐ ক্ষত নিশ্চয়ই অত্যন্ত তুচ্ছ এবং তেমন কিছু গুরুতর নহে কারণ বাহির হইতে যে আঘাত দেহের উপর লাগে তা যদি প্রচন্ড হয় তাহলে সমগ্র জীবসত্তা সমবেদনা প্রকাশ করে, জ্বরাদি লক্ষণ দেখা দেয়। এই প্রকার ব্যাধির চিকিৎসা অস্ত্রোপচারের বিধানে ছাড়িয়ে দেওয়া হয়, আক্রান্ত স্থানে যতোটুকু বাহ্য প্রতিকার প্রয়োজন ঠিক ততটুকুর জন্য। তাহাতে যে আরোগ্য হয়—-যাহা কেবল জীবনী-শক্তির ক্রিয়াশীলতার ভিতর দিয়াই আশা করা যায়—তাহার পথে যে বাহ্য বাধাসমূহ থাকে তাহা স্হূল উপায়ে দূর করা হয় যেমন, সন্ধিচ্যূত স্থানের পুনঃসংযোগ, সেলাই ও ব্যান্ডেজের সাহায্যে ক্ষতের মুখগুলিকে জোড়া লাগানো, বাহির হইতে চাপ দিয়া উন্মুক্ত ধমনীতে রক্ত স্রাব বন্ধ করা, দেহের কোন অংশে কিছু বিধিয়া থাকিলে তাহা টানিয়া বাহির করা, দেহের ভিতরে কোন গহ্বরে প্রদাহকর পদার্থ থাকিলে তাহা বাহির করিয়া দিবার জন্য প্রস্তুত করিয়া দেওয়া, সঞ্চিত রস বা তরল পদার্থ নিঃসারণ করা, ভগ্নাস্তির প্রান্ত গুলিকে সংযুক্ত করা এবং যথোপযুক্ত ব্যান্ডেজের সাহায্যে সেই গুলিকে যথাস্থানে রক্ষা করা প্রভৃতি। কিন্তু এই প্রকার আঘাতে সমগ্র জীবসত্তা যখন আরোগ্য কার্য সমাধানের জন্য জীবনীশক্তির সূকক্রিয়ার প্রয়োজন বোধ করে, জাহা সে সর্বদাই ভূত করিয়া থাকে, যেমন বিস্তৃতভাবে ভাঙ্গিয়া চুরিয়া, পেশি, শিরা, ধমনী ছিড়িয়া গিয়া প্রবল জ্বড় দেখা দিলে অভ্যন্তরীক ঔষধ প্রয়োগে যখন তাহা দূর করিবার দরকার হয় বা যখন ঝলসানো বা দগ্ধস্হানের বাহ্ যন্ত্রণা হোমিওপ্যাথিক মতে প্রশমিত করা হয়, তখন সূক্ষ্ম শক্তিতত্ত্বপন্থী চিকিৎসকের সেবা এবং তাহার সাহায্যকারী হোমিওপ্যাথির প্রয়োজন উপস্থিত হয়।
সূত্রঃ ১৮৭। কিন্তু বহিরঙ্গে প্রকাশমান ঐসকল ভোগ পরিবর্তন এবং পীড়া বাহ্য আঘাত হইতে উৎপন্ন না হইলে কিংবা সামান্য মাত্র বাহ্য আঘাত তাহাদের উত্তেজনার অব্যবহিত কারণ হইয়া থাকিলে সেইগুলি উদ্ভূত হয় সম্পূর্ণ অন্য প্রকারে। আভ্যন্তরিক কোন ব্যাধি হইলে তাহাদের উৎপত্তিস্থল। সেইগুলিকে কেবল স্থানীয় ব্যাধি বলিয়া ধরা এবং সেই সঙ্গে কেবল অস্ত্রোপচারের সাহায্য পাই সেই রূপে স্থানীয় প্রলেপ কিংবা সেই জাতীয় ঔষধ দ্বারা সেইগুলির চিকিৎসা করা—যাহা পুরাতন চিকিৎসা পন্থিগণ বহু যুগ হইতে করিয়া আসিতেছেন— যেমন অযৌক্তিক তেমনি অনিষ্টকর তাহার ফল।
সূত্রঃ ১৮৮। এই সকল ব্যাধিকে কেবলমাত্র স্থানীয় বলিয়া ধরা হইত এবং সেইজন্য সেইগুলিকে স্থানীয় ব্যাধি আখ্যা দেওয়া হইত, যেন সেই গুলি কেবলমাত্র ঐ সকল স্থানে সীমাবদ্ধ, তাহার সহিত জীবদেহের সম্পর্ক যেন অল্পই কিংবা একেবারেই নাই। ঐ সকল বিশেষ সুস্পষ্ট অংশের পীড়া সম্বন্ধে জীবদেহের বাকি অংশ যেন কোন খবরই রাখে না।
সূত্রঃ। ১৮৯। তথাপি অতি অল্প চিন্তা করিলেই ইহা বুঝা যাইবে যে, কোন বাহ্যিক রোগ (যদি তাহা বাহিরের আঘাতজনিত না হয়) উৎপন্ন হইতে পারে না, টিকিয়া থাকিতে পারে না, এমনকি অধিকতর মন্দাবস্থার দিকে যাইতে পারে না যদি না কোন আভ্যন্তরীক কারণ থাকে এবং যদি না সমগ্র জীবসত্তা অসুস্থ থাকার ফলে সহানুভূতিশীল হয়। ইহার উদ্ভব আদৌ সম্ভব পর হইতে না যদি বাকি স্বাস্থ্য তাহা সমগ্রভাবে অনুমোদন না করিত এবং জীবসত্তার বাকি অংশ (দেহের অনুভূতিশীল) তাহাতে অংশগ্রহণ না করিত । বস্তুত দেহের সকল অংশ অনুভূতি ও ক্রিয়ার দিক দিয়া এমন ঘনিষ্ঠ ও একাত্ম ভাবে পরস্পর গ্রথিত যে সমগ্র জীবদেহের ( বিশৃঙ্খলাপ্রাপ্ত) সাহায্য ব্যতীত কে হার উদ্ভব সম্বন্ধে ধারণা করা অসম্ভব’। ঠোঁটের উপর কোন উদ্ভিদ, আঙ্গুলহাড়া কখনই প্রকাশিত হইতে পারে না যদি পূর্ব হইতে এবং তৎকালীন আভ্যন্তরিক অসুস্থতা বিদ্যমান না থাকে।
সূত্রঃ ১৯০। অতএব, বহিরঙ্গে প্রকাশিত যে রোগ বাহিরের অল্প আঘাতে কিংবা কোন আঘাত ব্যতীত উৎপন্ন হইয়াছে তাহার প্রকৃত চিকিৎসা ন্যায়সঙ্গতভাবে, নিশ্চিতরূপে, সাফল্যের সহিত এবং সম্পূর্ণভাবে করিতে হইলে তাহা সমগ্র সত্তার উপর পরিচালিত করিতে হইবে যাহাতে আভ্যন্তরিক ঔষধ প্রয়োগে সর্বাঙ্গীণ ব্যাধি ধ্বংসপ্রাপ্ত হইয়া আরোগ্য সাধিত হয়।
সূত্রঃ ১৯১। ইহা সন্দেহাতীতভাবে অভিজ্ঞতার দ্বারা প্রমাণিত হইয়াছে যে, সকল ক্ষেত্রে প্রত্যেকটি বলশালী ঔষধ আভ্যন্তরিক প্রয়োগের পরেই এই প্রকার রোগীর সাধারণ স্বাস্থ্যে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনয়ন করে, বিশেষ করিয়া আক্রান্ত বহিরঙ্গে (সাধারণ চিকিৎসক মন্ডলী যাহাকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন বলিয়া মনে করেন), এমনকি দেহের সম্পূর্ণ বহিরংশের তথাকথিত স্থানীয় ব্যাধিতেও। ইহা দ্বারা যে পরিবর্তন সাধিত হয় তাহা সমগ্র দেহের স্বাস্থ্যকে ফিরাইয়া আনে এবং সেইসঙ্গে বাহ্য ব্যাধি ও (কোন ব্যাহ্য ঔষধের সাহায্য ব্যতীত) তিরোহিত হয় বলিয়া তাঁহা পরম উপকারী, অবশ্য যদি সমগ্র অবস্থাকে লক্ষ্য করিয়া প্রযুক্ত আভ্যন্তরিক ঔষধ হোমিওপ্যাথিক মতে সঠিক নির্বাচিত হইয়া থাকে।
সূত্রঃ ১৯২। ইহা সর্বাপেক্ষা ভালোভাবে সম্পূর্ণ করা যায় না যখন ঐ রোগ সম্বন্ধে অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে স্থানীয় ব্যাধির ঠিক প্রকৃতি এবং রোগীর স্বাস্হ্যে যে সকল পরিবর্তন, যন্ত্রণা ও লক্ষণ দেখা যায় তাহা এবং ঔষধ ব্যবহার করিবার পূর্বে যেমন দেখা গিয়াছিল সেই সকল একত্রিত করিয়া একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র প্রস্তুত করা যায়। যে সকল ঔষধের বিশেষ সামরিক লক্ষণ জানা আছে তাহাদের মধ্যে হইতে পরে লক্ষণ সমষ্টির সদৃশ এমন একটি অনুসন্ধান করা যায় যাহার নির্বাচন ঠিক হোমিওপ্যাথি সম্মত ।
সূত্রঃ ১৯৩। কেবলমাত্র এই ওষুধের আভ্যন্তরিক প্রয়োগ দ্বারা দেহের সাধারণ রুগ্নাবস্হার সহিত স্থানীয় ব্যাধি দূরীভূত হয়। পূর্বেরটির সঙ্গে পরেরটি ও একই সময়ে সারিয়া যায়। তাহা হইতে প্রমাণিত হয় যে স্থানীয় পীড়া দেহের বাকি অংশের ব্যাধির উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল এবং সেইজন্য তাহাকে সমগ্রের সহিত অবিচ্ছিন্ন এবং সমগ্র ব্যাধির সর্বপ্রধান গণনীয় বিশিষ্ট লক্ষণসমূহের অন্যতম বলিয়া ধরিতে হইবে।
সূত্রঃ ১৯৪। নবাগত অচিররোগেই হোক কিংবা বহুদিন স্থায়ী স্থানীয় ব্যাধিতেই হউক না কোন বাহ্য ঔষধের মহৌষধি হইলেও এবং সদৃশ লক্ষণহেতু তাহা আভ্যন্তরিক প্রয়োগে হইলেও, আক্রান্ত স্থানে তাহার মর্দন বা বাহ্য প্রলেপের আবশ্যকতা নাই, এমনকি একই সময়ে তাহা আভ্যন্তরিক প্রয়োগ করা হইলেও নহে। কারণ সেই সকল অচির ও স্থানীয় ব্যাধি (যেমন, বিশেষ স্থানের প্রদাহ, ইরিসিপেলাস ) যাহাদের উদ্ভবের সহিত বাহ্য আঘাতের প্রচণ্ডতার ঠিক মিল নাই, আভ্যন্তরিক কোন সূক্ষ্ম কারণ হইতেই যাহা উদ্ভূত, তাহা পরীক্ষিত ঔষধসমূহের সাধারণ ভান্ডার হইতে নির্বাচিত সেই ওষুধের আভ্যন্তরিক প্রয়োগেই সুনিশ্চিতভাবে প্রশমিত হয়, যে ওষুধ বাহির ও ভিতরের প্রতীয়মান স্বাস্থ্য অবস্থার উপযোগী ও লক্ষণসদৃশ; সাধারণত অন্য কোনো সাহায্যের প্রয়োজন হয় না। কিন্তু এই সকল রোগ যদি সেই ওষুধের কাছে সম্পূর্ণভাবে বশ্যতা স্বীকার না করে এবং পথ্যাদির সুব্যবস্থা সত্ত্বেও যদি আক্রান্ত স্থানের ও সমগ্র শরীরের স্বাভাবিক অবস্থার পুনরুদ্ধারে জীবনীশক্তির অক্ষমতায় অবশেষ থাকিয়া যায় তাহা হইলে সেই অচিররোগ ( যাহা প্রাই ঘটে) সোরাবীজের ফল, যাহা এযাবৎকাল ভিতর লুকাইয়াছিল, কিন্তু এখন প্রবলবেগে বাহির হইয়া স্পষ্ট চিররোগে পরিণত হইতে চলিয়াছে।
সূত্রঃ ১৯৫। এই সকল রোগকে- যাহা মোটেই বিরহ নহে- নির্মূল করিতে হইলে তাহাদের আক্রমণের প্রথম বেগ অনেকটা কমিয়া গেলে অবশিষ্ট লক্ষণের এবং রোগীর পূর্বের রুগ্নাবস্থার প্রতিকারের জন্য যথোচিত সোরাবিষঘ্ন চিকিৎসা ( আমার ক্রনিক ডিজিজেস গ্রন্থের উপদেশ অনুসারে ) করিয়া যাওয়া অবশ্যই প্রয়োজন । যে সকল পুরাতন স্থানীয় ব্যাধি স্পষ্টতই যৌন কারণ হইতে উৎপন্ন নহে তাহাদের জন্য সোরাবিষঘ্ন আভ্যন্তরিক চিকিৎসারই একমাত্র প্রয়োজন।
সূত্রঃ ১৯৬। বস্তুত ইহা মনে হইতে পারে যে, লক্ষণসমূহ অনুসারে যথার্থ হোমিওপ্যাথিক ঔষধ শুধু আভ্যন্তরিক প্রয়োগে নহে তৎসহ ভাজ্য প্রয়োগে এইরূপ রোগসমূহের আরোগ্য সম্পাদন ত্বরান্বিত হইবে, কারণ রোগের স্থানে ওষুধের প্রলেপ লাগাইলে তাহার ক্রিয়া রোগের দ্রুত পরিবর্তন সাধন করে।
সূত্রঃ ১৯৭। সোরাবীজ হইতে উদ্ভূত স্থানীয় ব্যাধি সম্পর্কেই শুধু নয়, সিফিলিস ও সাইকোসিসবীজ হইতে উৎপন্ন ঐ প্রকার ব্যাধি সম্বন্ধেও এই প্রকার চিকিৎসা সমর্থন করা যায় না কারণ, কোন স্থায়ী স্থানীয় ব্যাধিই যেখানে প্রধান লক্ষণ, সেখানে কোন ওষুধের বাহ্য ও আভ্যন্তরিক প্রয়োগ একই সঙ্গে করার বড় অসুবিধা এই যে, এরূপ বাহ্য প্রয়োগের ফলে প্রধান লক্ষণটি ভিতরের ব্যাধি অপেক্ষা দ্রুত লোপ পায় এবং তখন সারিয়া গিয়াছে বলিয়া আমরা প্রতারিত হয়; অথবা অন্তত স্থানীয় লক্ষণটি অকালে অন্তর্হিত হওয়ায় এই একই সময়ে যে আভ্যন্তরিক ওষুধ প্রয়োগ করা হইয়াছিল তদ্দ্বারা সমগ্র ব্যাধি বিনষ্ট হইল কিনা তাহা নির্ণয় করা কেবল কঠিন তাহাই নহে কোন কোন ক্ষেত্রে অসম্ভব।
সূত্রঃ ১৯৮। সেবন করা হইলে যে সকল ঔষধ আরোগ্যদানে সমর্থ, চিররোগবীজজাত ব্যাধির বাহ্য লক্ষণে সেগুলির কেবলমাত্র স্থানীয় প্রয়োগ সেই কারণে একেবারেই সমর্থনযোগ্য নহে। কারণ চিররোগের স্থানীয় লক্ষণটি যদি কেবল স্থানীয় এবং একতরফাভাবে অপসারিত হয়, তাহা হইলে আভ্যন্তরিক চিকিৎসা যাহা স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের জন্য অপরিহার্য তাহা সংশয়ের দুর্বোধ্যতায় আচ্ছন্ন হইয়া পড়ে। প্রধান লক্ষণটি ( স্থানীয় ব্যাধি) চলিয়া গেলে থাকে কেবল বিশেষত্বহীন সেই লক্ষণগুলি যেগুলি স্থানীয় ব্যাধি অপেক্ষা কম অপরিবর্তনীয় ও কম স্থায়ী এবং যাহা প্রায়ই অসাধারণত্ববর্জিত বলিয়া রোগচিত্রের স্পষ্ট ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ পরিচয়ের লক্ষণরূপে অত্যন্ত দুর্বল।
সূত্রঃ ১৯৯। যথাযথ হোমিওপ্যাথিক ঔষধ আবিষ্কৃত হইবার পূর্বে যখন স্থানীয় লক্ষণগুলি ক্ষয়িষ্ণু, শোষক প্রভৃতি ঔষধের বাহ্য প্রয়োগে কিংবা অস্ত্রোপচারে বিনষ্ট করা হইত তখন অবশিষ্ট লক্ষণগুলি অত্যন্ত অস্পষ্ট ও পরিবর্তনশীল থাকায় রোগ আরো বেশি দুঃসাধ্য হইয়া পড়িত। কারণ ঠিকমত ঔষধ নির্বাচন এবং যে পর্যন্ত রোগটি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস প্রাপ্ত না হয় সে পর্যন্ত ওষুধটির আভ্যন্তরিক প্রয়োগ করিবার নির্দেশ যেসকল লক্ষণ হইতে পাওয়া যাইত, অর্থাৎ বাহিরের প্রধান লক্ষণ, তাহাকে আমাদের দৃষ্টিবহির্ভূত করা হইয়াছে।
সূত্রঃ ২০০। আভ্যন্তরিক চিকিৎসার জন্য তখনো যদি উহা বিদ্যমান থাকিত তাহা হইলে সমগ্র ব্যাধির জন্য হোমিওপ্যাথিক ঔষধ খুঁজিয়া বাহির করা যাইতে পারিত এবং তাহা পাওয়া যাইলে স্থানীয় ব্যাধির অস্তিত্ব হইতে বুঝা যাইতো যে আরোগ্য সম্পূর্ণ হয় নাই। কিন্তু উহা যথাস্থানে থাকিয়া আরোগ্যলাভ করিলে নিঃসংয়ভাবে প্রমানিত হইত যে রোগটি সম্পূর্ণভাবে নির্মূল হইয়াছে এবং সমগ্র রোগ হইতে ঈপ্সিত আরোগ্যপ্রাপ্তি পূর্ণভাবে সাধিত হইয়াছে । পূ্র্ণ আরোগ্যপ্রাপ্তির পক্ষে ইহাই হইলো অমূল্য ও অপরিহার্য উপায়।
সূত্রঃ ২০১। ইহা স্পষ্ট যে মানুষের জীবনীশক্তি যখন চিররোগগ্রস্থ হয়, যাহাকে উহা সামাজিকভাবে নিজ ক্ষমতায় পরাভূত করিতে অসমর্থ, তখন তাহা দেহের উপরে কোথাও একটি স্থানীয় ব্যাধি উদ্ভবের ব্যবস্থা করে কেবলমাত্র এই উদ্দেশ্যে যে, যে অংশটি জীবনের পক্ষে অপরিহার্য নহে তাহাকে অসুস্থ করা এবং অসুস্থ অবস্থায় রাখা যাহাতে আভ্যন্তরিক ব্যাধিকে প্রশমিত রাখা যায় যাহা অন্যথায় জীবনরক্ষক যন্ত্রসমূহকে ধ্বংস করেছে ( এবং রোগীর প্রাণনাশ করিতে ) পারে। বলিতে গেলে উহা আভ্যন্তরিক ব্যাধিকে প্রতিনিধিরূপে স্থানীয় ব্যাধিতে রূপান্তরিত করিয়া তথায় আকর্ষণ করিয়া রাখে। এই স্থানীয় পীড়ার উপস্থিতি কিছুকালের জন্য আভ্যন্তরিক ব্যাধিকে দমন করিয়া রাখে, যদিও তাহাকে নিরাময় করিতে বা হ্রাস করিতে পারেনা। স্থানীয় রোগ সমগ্র ব্যাধির অংশ ব্যতীত কিছুই নহে, কিন্তু সেই অংশ জীবনীশক্তি কর্তৃক কেবল একমুখী বর্ধিত অবস্থা- আভ্যন্তরিক পীড়ার প্রশমনার্থে যাহা দেহের কম মারাত্মক স্থানে ( বাহিরে ) স্থানান্তরিত হয় মাত্র। কিন্তু ( যেমন পূর্বে বলা হইয়াছে ) এই স্থানীয় লক্ষণ আভ্যন্তরিক ব্যাধির প্রশমন করিলেও সমগ্র ব্যাধির হ্রাস বা আরোগ্যকল্পে জীবনীশক্তির কিছুই লাভ হয় না। অপরপক্ষে তাহা সত্ত্বেও আভ্যন্তরিক ব্যাধি ক্রমশ বাড়িয়াই চলে এবং প্রকৃতিও স্থানীয় লক্ষণকে অধিক হইতে অধিকতর বিস্তার ও বর্ধিত করিতে বাধ্য হয় যাহাতে তাহা বর্ধিত আভ্যন্তরিক ব্যাধির পরিবর্তে যথেষ্টভাবে বিদ্যমান থাকিয়া তাহাকে দমন করিয়া রাখিতে পারে ।আভ্যন্তরিক সোরা যতদিন না আরোগ্যপ্রাপ্ত হয় ততদিন পায়ের ক্ষত খারাপের দিকে চলে, আভ্যন্তরীণ সিফিলিস আরোগ্য না হওয়া পর্যন্ত স্যাঙ্কার বাড়িয়াই চলে, ডুমুরাকৃতি অর্বুদসমূহ সাইকোসিস আরোগ্য প্রাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত বৃদ্ধি পাইতে ও উৎপন্ন হইতে থাকে; তাহার ফলে শেষোক্তটির আরোগ্যলাভ অধিকতর কঠিন হইয়া পড়ে, কারণ কালক্ষেপের সঙ্গে সঙ্গে আভ্যন্তরিক পীড়াও বাড়িয়া চলে।
সূত্রঃ ২০২। সমগ্র ব্যাধি সারিয়া যাইবে এই বিশ্বাসে এখন যদি পুরাতন পন্থী চিকিৎসক বাহ্য ঔষধ প্রয়োগে স্থানীয় লক্ষণকে নষ্ট করেন তাহা হইলে আভ্যন্তরিক ব্যাধি এবং অন্যান্য লক্ষণ যাহা পূর্ব হইতে স্থানীয় লক্ষণের পাশাপাশি সুপ্ত অবস্থায় ছিল সেইগুলিকে জাগরিত করিয়া প্রকৃতি তাহার ক্ষতিপূরণ করে, অর্থাৎ আভ্যন্তরিক ব্যাধিকে বাড়াইয়া তোলে। যখন এই রূপ ঘটে তখন ইহা বলা হয়, যদি ভুলক্রমে, স্থানীয় ব্যাধিকে বাহ্য ওষুধ প্রয়োগে দেহাভ্যন্তরে কিংবা স্নায়ুযন্ত্রে ফেরত পাঠান হইয়াছে।
সূত্রঃ ২০৩। এইরূপ স্থানীয় লক্ষণসমূহের প্রত্যেকটির ক্ষতিকর বাহ্য চিকিৎসা, যাহার উদ্দেশ্য হইল দেহের বহির্দেশ হইতে সেইগুলিকে দূর করা, অথচ আভ্যন্তরিক রোগবীজকে অচিকিৎসিত অবস্থায় ফেলিয়া রাখা, যেন নানাপ্রকার মলম-প্রয়োগে সোরাবীষজাত উদ্ভিদকে অপসারিত করা, কস্টিক দ্বারা উপদংশ ক্ষতকে পোড়াইয়া ফেলা, অর্বুদ গুলিকে তাহাদের স্থান হইতে ছুরিকা দ্বারা বন্ধনী বা উত্তপ্ত লৌহ শলাকা দ্বারা ধ্বংস করা- এযাবৎকাল এরূপ ব্যাপকভাবে অনুষ্ঠিত হইয়া আসিতেছে যে তাহা মানবের যন্ত্রণাদায়ক পরিচিত-অপরিচিত সকল প্রকার চিররোগের মূল কারণ। ইহা চিকিৎসাজগতের সর্বাপেক্ষা গর্হিত অপরাধমূলক অনুষ্ঠানসমূহের অন্যতম; তথাপি ইহা সাধারণভাবে এযাবৎ গৃহীত হইয়া আসিতেছে এবং শিক্ষাকেন্দ্রসমূহ হইতে একমাত্র উপায় বলিয়া শিক্ষা দেওয়া হইতেছে।