ডাঃ হাসান মির্জা এর চিকিৎসার কিছু টেকনিক।

ডাঃ হাসান মির্জার কাছে ১৯৮২, ৮৩ সালে কিছুদিন গিয়েছিলাম।
কিন্তু ঐ একই সময়ে শেখার জন্য ডাঃ এস পি দে, ডাঃ জে এন কাঞ্জিলাল, প্রমুখদের কাছে প্রত্যহ যেতাম বলে তার কাছে আর যেতে চাই নি,
কারন, সত্যি কথা বলতে কি, আমরা কলেজে যা শিখেছিলাম, গুছিয়ে কেস টেকিং করে রোগী দেখা-
Present Complaints, Past History, Personal History, Generalities, Investigations,
সব মিলিয়ে চিন্তা ভাবনা করে একটি ঔষধ সিলেকশন করতে হবে, এই সব মাষ্টারমশাইদের কাছে সেই সিস্টেমেটিকে দেখতাম, ফলে তা শিখতাম, ভাল লাগতো।
কিন্তু ডাঃ হাসানের সারা বাংলাব্যাপী নাম বা ক্রেজ দেখে শিখতে গেলেও তার চেম্বার, পরিবেশ, স্টাইল অফ ট্রিটমেন্ট দেখে মন ভরে নি। তাই টানা তার কাছ থেকে শেখার ততটা আগ্রহবোধ করিনি।
পরে ১৯৮৩ থেকে ২০০৪ র মধ্যে মাঝেমধ্যে তার সাথে দেখা করেছি, ঠিক শেখার মনোভাব নিয়ে যেতাম না, মাঝেমধ্যে বেলুড়, বালি, উত্তরপাড়া, ভদ্রেশ্বর, কোন্নগড়, শ্রীরামপুর, ইত্যাদি জায়গায় আমার কল থাকলে তার বালীর চেম্বারে একবার ঢুঁ মারতাম। তার মধ্যে কোন আন্তরিকতার অভাব ছিল না, যখনই যেতাম, শত ব্যস্ততার মাঝেও কিছু কথাবার্তা বলতেন।
যতবারই গেছি তার প্রেসক্রিপশন করার টেকনিক দেখেছি মোটামুটি একই স্টাইলে ২টি ঔষধ, নোট করে নিতাম পরে বই খুলে দেখবো বলে, অনেক বইতে বেশীর ভাগ মিলানো যায় না, কেন্টে কিছু কিছু অাভাষ পেতাম, ছোট ৬”x৪”র পাতলা সস্তার কাগজে বানানো ওনার সাদাসিদা প্যাডে দুইটি ঔষধের নাম লেখা থাকতো, প্রায়ই 200, 1M, বা CM শক্তির,
বেশীরভাগ ক্ষেত্রে ঔষধ থাকতো– Bacillinum, Medorrhinum, Syphylinum, Tuberculinum, Lycopodium, Natrum Sulph, Thuja, ইত্যাদি Master miasmatic medicines, বেশ কিছু রোগীকে ১) Bacillinum ২) Lycopodium দিতে দেখেছি,
সিমপটমস দিয়ে কিছু বোঝা যেত না, কিছু জিজ্ঞাসা করার পরিবেশ থাকে না, কারন– রেশন দোকানের মতন লাইন দিয়ে লোক দাঁড়িয়ে থাকে, পরপর এগোয়, আর লাজ লজ্জার মাথা খেয়ে ২/১টি জিজ্ঞাসা করলেও উনি উত্তর না দিয়ে রসিকতা করে অন্য পেশেন্টে চলে যেতেন,
তাই আমার মনে হয় — ওনার যদি অর্ন্তদৃষ্টি, বা একসট্রা কিছু অনুধাবন করার ক্ষমতা থেকে থাকে তবে যারা ওনার কাছে থেকেছে, গুরু বলে লম্ফঝম্ফ করছে, আসলে আদতে সেই অন্তর্দৃষ্টি কিছুই শেখেনি।
তবে বাংলাদেশ থেকে বের হওয়া বইয়ের কভারে তার যে ছবি দেখা যায়, তা তার পূর্বের চেহারার সাথে মোটেই মেলে না, এক মাথা কালো চুলে এবং দাড়িতে লাল মেহেন্দী লাগানো সুঠাম চেহারা ছিল তার।
যা নোট করেছিলাম, কিছু বলছি, যদি কেউ বুঝে ব্যবহার করতে পারেন–
★ চুল উঠছে খুব, নখ দেখাও, নখ দেখলেন একজন, প্রেসক্রিপশন করেলেন-
1) Bacillinum CM, 2) Lycopodium CM কিছুই বুঝিনি, ফলোআপও দেখা হয় নি,
★ গণিখান চৌধুরীকে কিডনী স্টোনে–
1) Syphylinum CM, 2) Berberis Vulgaris 1 M, রেজাল্ট জানতে পাররিনি,
★ একজন মহিলাকে ব্রনোর জন্য দিয়েছিলেন Calcarea Sulph 1 M
★ একটি বাতের ব্যথায় নখ দেখে আর কোন কথা না শুনে দিয়েছিলেন—
1) Syphylinum CM, 2) Causticum CM
★ একটি সোরিয়েসিস কেসে নখ দেখার পরে দিয়েছিলেন –
1) Syphylinum CM, 2) Arsenic Iod 200,
★ একটি অচৈতন্য মৃতবৎ বাচ্চাকে বাঁচবে না বলে ফেরত দিয়েছিলো হাসপাতাল, তাকে এ্যব্রোটেনাম ৩০, ২ ডোজ দেওয়াতে প্রচুর প্রস্রাব হয়, এবং পরে সুস্থ হয়,
★ একটি ছেলেকে পেটের গন্ডগোল আর সর্দি শুনেই Calcarea Phos দিয়েছিলেন, ফলো আপ জানতে পারিনি,
★ অর্শ শুনেই দিয়েছিলেন- 1) Medorrhinum, 2) Aesculus Hippo
★ একটি সোরিয়েসিস কেসে দিয়েছিলেন- 1) Thuja 200, 2)Syphylinum CM, 3) Arsenic. Iod 200

তিনি কোন জেনারেল কলেজে পড়েন নি, কোন প্রাতিষ্ঠানিক হোমিওপ্যাথিক কলেজে পড়েন নি, যদিও সেই সময় কলকাতার হোমিওপ্যাথিক কলেজগুলিতে এভেনিং সেকশন ছিল, তিনি দিনের বেলা চেম্বার করে সন্ধ্যায় তিন ঘন্টা ক্লাস করে অনায়াসে ডিএমএস কোর্স করতে পারতেন, কিন্তু করেননি কেন জানি না।
যাই হোক, 12 বছর ধরে একজন প্রাগমাটিক হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকের পিছনে দাঁড়িয়ে তিনি তার চিকিৎসার স্টাইল ফলো করে এবং পরে নিজে বই পড়ে, খুব কম টাকা নিয়ে মানুষের সেবার মনোভাব নিয়ে এক অখ্যাত জায়গায় তার চিকিৎসা জীবন শুরু করেছিলেন।
প্রাতিষ্ঠানিক হোমিওপ্যাথিক কলেজে না পড়ার জন্য স্বাভাবিকভাবেই হয়ত মেডিকেল এ্যালায়েড সাবজেক্টগুলিতে তার ভাল দখল থাকার কথা নয়, কিন্তু মেটিরিয়া মেডিকা রাত দিন পড়ে এবং তার অসম্ভব মেধার বিচ্ছুরণ ঘটিয়ে তিনি হোমিওপ্যাথিক ঔষধের উপরে আকাশচুম্বী পান্ডিত্য অর্জন করেন। অর্গানন অব মেডিসিনের কিছু জায়গার গুরুত্ব না দিলেও হ্যানিমান সাহেবের মায়াজমকে তিনি সাংঘাতিকভাবে, বরং আমি বলবো —আরো অনেকের থেকেও অত্যন্ত বেশী গুরুত্ব দিয়েছেন।
কারণ তার চিকিৎসার মূল সূত্র ছিলো মায়াজমেটিক বা মায়াজম ভিত্তিক চিকিৎসা।
কেমন ছিল তার মায়াজমেটিক চিকিৎসা?
কি বলেছেন তিনি?
তিনি ৩টি ঔষধ—-ব্যাসিলিনাম, সিফিলিনাম, এবং মেডোরিনামের যে কোন একটি প্রথমে প্রয়োগ করে তারপর পরবর্তী ঔষধ নির্বাচিত করতে বলেছেন ।
তিনি স্পষ্টত বলেছেন—-“তিনটি নোসডস ঔষধ—-Baci, Syphy, এবং Medo প্রয়োগ করে তারপর পরবর্তী নির্বাচিত ঔষধ প্রয়োগ না করলে চিকিৎসকের সমস্ত প্রচেষ্টাই পন্ডশ্রমে পরিণত হবে।
সুতরাং একজন হোমিও চিকিৎসককে ঈগল পাখির চোখ দিয়ে রোগী ও রোগ নির্ণয়ের সাথে সাথে সোরার রোগী হলে ব্যাসিলিনাম, সাইকোসিসের রোগী হলে মেডোরিনাম, এবং সিফিলিসের রোগী হলে সিফিলিনাম দিয়ে চিকিৎসায় অগ্রসর হতে হবে”।
তিনি সাইকোসিসের জন্য প্রধান ঔষধ বলতে চেয়েছেন মেডোরিনাম, সিফিলিসের জন্য সিফিলিনাম —– সবাই তা বলে থাকেন বা বলেছেন।
কিন্তু অদ্ভুতভাবে বা নতুনভাবে বা তার নিজস্ব অভিজ্ঞতায় সোরার জন্য প্রধান ঔষধ তিনি সালফার বা সোরিনাম নয়, বলতে চেয়েছেন -ব্যাসিলিনাম।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তিনি রোগীর মায়াজম বুঝে এই তিনটি ঔষধের একটি এক নম্বরে রাখতেন, আর দ্বিতীয় ঔষটি রোগ ও রোগীর সামঞ্জস্য বজায় রেখে প্রথম ওষুধের কম্প্লিমেন্টারি বা সেই মুহুতের রোগীর সিলেকটেড ঔষধ রাখতেন।
এটা তার নিজস্ব একটা অভিজ্ঞতা বা চিন্তাধারার ফসল।
অন্য কারুর বইয়ে, বা লেখায়, বা বক্তব্যে তার এই উপদেশের প্রতিফলন আমরা পাইনি।
তার বক্তব্য— তিনি এইভাবে ফল পেয়েছেন অসাধারণ। যেমন—
উদাহরণ- (১)—–মাথা ব্যথার ক্ষেত্রে তিনি বলছেন রোগটি যদি ক্রনিক বা বহুদিনের পুরাতন হয় , তবে সিফিলিনাম উচ্চ শক্তির দুটি মাত্রা আগে দিতে হবে, তারপরে দিতে হবে লক্ষনভিত্তিক অন্য ঔষধ।
উদাহরণ- (২)—–৮ বছরের এক বালকের ৩ বছর বয়সে নিউমোনিয়া হওয়ার পর থেকে তার সর্দি কাশি লেগেই থাকতো, একবার আবার নিউমোনিয়ার মতন সিমপটমস দেখা দিলে তার চেম্বারে যখন বাচ্চাটিকে আনা হয়, বাচ্চাটির মা তাকে সমানে পাখার বাতাস করছিলেন। হাসান সাহেব বাচ্চাটির হাত পা শরীর ঠান্ডা থাকা সত্ত্বেও তার মা পাখার বাতাস করছে কেন জিজ্ঞাসায় তার মায়ের কাছে শুনেছিলেন — বাচ্চা পাখার বাতাস চাইছে, ও নিজেই বাতাস করতে বলছে, কার্বো ভেজ ইন্ডিকেটেড মেডিসিন, আমরা সবাই বুঝতে পারছি, কিন্তু ডাঃ হাসান তার একজন প্রিয় ছাত্র ফেজুকে বলেছিলেন— তাকে আগে সিফিলিনাম দুই মাত্রা দিয়ে তারপরে কার্বো ভেজ দিতে। বলা বাহুল্য বাচ্চাটি সুস্থ হয়েছিল।
মাঝে মাঝে তার অনেক কেসের গল্প জানাবো।
আমি তার সান্নিধ্যে বেশ কয়েকবার গেছি, তার বহু আরোগ্য করা কেসের গল্পও শুনেছি । রোগী অবজার্ভেসনের এবং মেটিরিয়ার ঔষধগুলির উপরে তার অসাধারণ পাণ্ডিত্য আমি দেখেছি।
কিন্তু তার প্রথমে রোগীর সিমপটমস বিহীন বাঁধাধরা এই যে একটি প্রধান এ্যান্টি মায়াজমেটিক ঔষধ দেওয়া, এবং দ্বিতীয় সিলেকটেড ঔষধটি তার অব্যবহিত পরেই দেওয়া—
এই থিওরীগুলি অর্গানন ভিত্তিক নয়, এবং অনেকে সমর্থন করেন না, সাধারণ নিয়মে কারুর পক্ষে মানা সম্ভবও নয়। ব্যাপারটি আমাদেরকে ভাবায়।
কিন্তু এটা তো ঘটনা—-প্রত্যেকটি বিষয়ের মধ্যে চিন্তার খোরাক থাকে, চেতনার উন্মেষ থাকে।

তাই অামি তার মতন অসাধারণ পাণ্ডিত্যপূর্ণ অবজারভেশনস মাষ্টারকে, মেটিরিয়া, বা মায়াজমের মান্যতা দেওয়া হোমিওপ্যাথিক ব্যক্তিত্বকে —-
অমল, শ্যামল, বিমল, শেগাল, এসব হোমিওপ্যাথদের সাথে কিন্তু মেশাতে পারি না।
এরা ধান্দাবাজ, এদের নীতি নেই, এদের উদ্দেশ্য ব্যবসা, এদের উদ্দেশ্য প্রতারনা, হোমিওপ্যাথদের বিভ্রান্ত করা, হোমিওপ্যাথিকে কফিনে পাঠানো,
কিন্তু হাসান সাহেব ছিলেন—
ন্যায়নিষ্ঠ, মানব দরদী, হোমিওপ্যাথির এক পূজারী,
হতে পারে তিনি তার নিজস্ব একটা স্টাইল তৈরি করেছিলেন,
কিন্তু তা অপ হোমিওপ্যাথি নয়,
তিনি পাঁচটা ঔষধ মেশান নি,
তিনি জীবনে মাদার দেন নি,
তিনি বায়োকেমিক দেন নি,
তিনি পেটেন্ট, টনিক দেন নি,
তিনি কোথাও কোন ভনিতা দেখান নি,
তিনি ছিলেন—এক নিরহংকারী, সাদাসিধা, ঈশ্বরে বিশ্বাসী, সৎ, ও নিষ্ঠাবান মানুষ,
তার স্টাইল অব ট্রিটমেন্ট রিসার্চের ব্যাপার, ফেলে দেওয়ার ব্যাপার নয়।
ডাঃ ক্রম্পটন বার্নেটও তার নিজস্ব একটা স্টাইল তৈরি করেছিলেন।
তার চিকিৎসার পদ্ধতি গতানুগতিক হ্যানিম্যানিয়ান পদ্ধতি মেনে করা হয়নি।
আমি নিজে ব্যক্তিগতভাবে হ্যানিম্যানিয়ান পদ্ধতি মেনে চিকিৎসা করি।
জগত বরেণ্য হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকরা বেশিরভাগই হ্যানিম্যানিয়ান পদ্ধতিতে চিকিৎসা করেছেন। ব্যতিক্রমী ভিন্নমত অবশ্য পোষণ করেছেন কেউ কেউ।
বোনিংহোসেন, নীলমণি ঘটক রাধারমন বিশ্বাস, বাবু রাজেন দত্ত, ফাদার মুলার —–এরকম অনেকেই হোমিওপ্যাথিক প্রাতিষ্ঠানিক কলেজে পড়েন নি, কিন্তু তারা লব্ধ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক হয়েছিলেন।
দুটি পয়েন্ট বলতে চাই —
১) এই রকম যারা নাম করেছেন, যশস্বী হয়েছেন, আন্তরিক ইচ্ছা থাকায় তারা নিজেরা বাড়িতে নিঃসন্দেহে সব বিষয়ে কিছু না কিছু পড়াশোনা করেছেন, কারন তারা সবাই মেরিটোরিয়াস ছিলেন।
ডাঃ হাসানের ক্ষেত্রেও ধরা যেতে পারে তার ব্যতিক্রম হয় নি।
তাছাড়া তিনি তখনকার দিনের শিয়ালদহের বেঙ্গল মেডিকেল ইউনিয়নে রবিবারে পড়তেন, সেখানে সব বিষয়ে মোটামুটি পড়াশোনা করানো হতো, এবং সব বিষয়ের পরীক্ষার মাধ্যমে হোমিওপ্যাথিক কাউন্সিল Part-B উপাধিতে তাদের রেজিস্টেশন দিয়েছেন।
২) এ্যানাটমি, ফিজিওলজি, ইত্যাদি বিষয়ে সম্যক জ্ঞাণ থাকার নিশ্চয় দরকার, তবে বহু ক্ষেত্রে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় সঠিক প্রেসক্রিপশন করার জন্য তার বহুল প্রয়োজন হয় না।
একটি প্যারালাইসিস রোগীকে কস্টিকাম প্রেসক্রিপশন করতে,
একটি মানসিক রোগীকে থুজা প্রেসক্রিপশন করতে,
একটি পাগলকে স্ট্রামোনিয়াম প্রেসক্রিপশন করতে,
একটি টনসিলাইটিসের রোগীকে ফাইটোলাক্কা প্রেসক্রিপশন করতে,
একটি মাথার চুল উঠে যাওয়ার রোগীকে সিপিয়া প্রেসক্রিপশন করতে,
আমাদের অত্যন্ত বেশি এ্যানাটমী, ফিজিওলজী, বা প্যাথলজীর প্রয়োজন আছে কি?
কিছু ক্ষেত্রে অবশ্যই প্রয়োজন, যা আমি বিস্তৃতভাবে আমার এ্যাকিউট প্যাংক্রিয়াটাইটিস চ্যাপ্টারে বলেছি।
অনেকে বিদ্রুপ করেছেন — যেখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখো তাই, তাই বলে ভাগাড়ের ছাইকে নয়, এই মন্তব্য আমার কাছে খুব কষ্টকর মনে হয়েছে, সান্তনার প্রলেপ এটাই— বাইরে থেকে তারা ডাক্তার হাসানকে উপলব্ধি করতে পারেন নি।
তারা জানতে পারেননি তার ছিলো — অসম্ভব রকমের তড়িৎগতিতে ঔষধ সিলেকশন করার এক অসাধারণ দৃষ্টি, রোগী পর্যবেক্ষন করার এক অনন্য ক্ষমতা, আর আমাদের দৃষ্টিগোচর এক অন্তর্দৃষ্টি,
আমি তার ঔষধ প্রয়োগ নীতি যা অর্গানন অসমর্থিত কথা সবাইকে পালন করতে বলছি না,
সেই ব্যাপারে আলোচনাও করতে চাইছি না,
আমি চাইছি যদি কেউ তার মেটিরিয়া জ্ঞাণের অবজারভেশনগুলি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখতে চান,
তাই, তা সবার মাঝে শেয়ার করছি,
তার অসংখ্য উল্লেখযোগ্য আরোগ্য রয়েছে যা আমাদের অনেকেরই নেই,
হোমিওপ্যাথিকে অবিজ্ঞান অপবিজ্ঞান অনেকে বলছেন, আমরা প্রতিবাদ করছি,
বিজ্ঞান না হলে যেমন হোমিওপ্যাথি এতদিন টিঁকে থাকতে পারতো না,
তেমনি বলতে চাই—ডাঃ হাসানের ক্ষেত্রে শুধু কম টাকা নেওয়ার জন্যই এত অসংখ্য রোগী হয়নি, অনেক উল্লেখযোগ্য আরোগ্যও তার দ্বারা সম্ভব হয়েছে, আর তার জন্যই তার গগনচুম্বী সুনাম হয়েছিলো, তার জন্যই সম্ভব হয়েছিল, তার পক্ষে —–
★ প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্লচন্দ্র সেনকে চিকিৎসা করার,
★ প্রাক্তন রেলমন্ত্রী এ বি এ গণিখান চৌধুরীকে চিকিৎসা করার,
★ কেন্দ্রীয় সম্প্রচার মন্ত্রী প্রিয়রঞ্জন দাসমুন্সীকে চিকিৎসা করার, ইত্যাদি,
দীর্ঘ 60 বছর ধরে বহু পরীক্ষা নিরীক্ষা করে তিনি বহু ক্লু দিয়েছেন,
হয়তো কিছু তার গুরু মতিলাল বাবুর থেকে পাওয়া, নয়তো নিজের অভিজ্ঞতালব্ধ প্রতিষ্ঠিত সত্য, যা তার নিজস্ব উপলব্ধি, যা অনেক বইয়ে ঠিকমতন পাওয়া যায় না, তিনি কোথায় পেলেন, কিভাবে পেলেন, কাজ হচ্ছে কি না, সমালোচনা না করে আমরা আমাদের ব্যবহারিক জীবনে তো প্রয়োগ করে দেখতে পারি, দেখতে দোষ কি? সময় হয়ত উত্তর দিতে পারে।
প্রথমে একটি মায়াজমেটিক ঔষধ দিয়ে পরে অন্য সিলেক্টেড ঔষধ, তার এই থিওরী নাই বা মানলাম, কিন্তু তার সুদীর্ঘ ৬০ বছরের অবিরামভাবে হাজার হাজার রোগী দেখার —
অবজারভারভেশনগুলি বা ক্লুগুলি অবহেলা না করে আমাদের প্রাকটিস জীবনে পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে দোষ কি? আসুন না পরীক্ষা করি–
★মেজাজী কন্ঠের আওয়াজ শুনলে— ল্যাকেসিস,
★থলথলে, নাদুসনুদুস চেহারার সাজুগুজু করা মহিলা যদি তার সিঁথিতে খুব মোটা করে চকচকে সিঁদুর দেয়— পালসেটিলা,
★ সকালে ডান দিকে আর বিকালে বাম দিকে মাথা ধরায়— বোভিষ্টা,
★ ইমপোটেনসি বা ধ্বজভঙ্গের জন্য সাইকোটিক রোগীকে– মেডোরিনাম,
★ রাত ঠিক ১১ টায় কাশি— রিউমেক্স, ইত্যাদি, ইত্যাদি।

এবারে তার একটি কেস বলছি, যেটা থেকে দুইটি জিনিস পাবেন—
১) কাশিতে ড্রসেরার ব্যবহার,
২) মানবিক মূল্যবোধের ডাঃ হাসান, তার মূল্যবান জীবন দর্শনের কিছু কথা, “বছর দশেক পূর্বেকার এক ঘটনা। জানুয়ারি মাস । শীতের হিমেল বাতাসে চতুর্দিক হাড় কাঁপানো ঠান্ডা। রাত্রি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘন কুয়াশার চাদরে মুড়ে যায় পথঘাট। নিশুতি রাত। আমি গভীর নিদ্রায় মগ্ন। আমারই এক প্রতিবেশী শিশুর রাত্রি দুটোর সময় তীব্র কাশি শুরু হয়। কাশির ধমকে ভুক্ত দ্রব্য উঠে আসে, শ্লেষ্মাবমনও হয়। প্রতিবেশী বন্ধুটি আমার দরজায় এসে ধাক্কা মারে। একবার, দুই বার, তিনবার। আমার ঘুম ভেঙে যায় । অত রাত্রিবেলা কনকনে ঠান্ডায় লেপ ছেড়ে উঠতে আমার খুব বিরক্ত লেগেছিল। উঠি উঠি করেও প্রায় দশ মিনিট পরে উঠে দরজা খুলেছিলাম। প্রতিবেশী বন্ধুটি আমার দরজার সামনে তার শিশুপুত্রকে নিয়ে ঠায় দাঁড়িয়েছিল। শিশুটি ভীষণ ভাবে কাশছিল। লক্ষ্য করলাম শিশুটির কাশির প্রকৃতিটি ছিল ড্রসেরা জ্ঞাপক। বিলম্ব না করে ড্রসেরা ৩০ শক্তির এক শিশি ঔষধ দিলাম। মাত্র দুটি মাত্রা খাওয়ানোর উপরেই শিশুর কাশি কম পড়ে এবং সে ঘুমিয়ে পড়ে । আমিও ঘুমিয়ে পড়ি।
আমার নিত্য অভ্যাসের মধ্যে একটি ছিল ভোরে ঘুম থেকে ওঠা । সেদিনও যথারীতি ঘুম থেকে উঠে পড়ি। ভোরের আজান আমার এই অভ্যাসটি তৈরি করে দেয়। অজু করে ফজরের নামাজ শেষ করি। ঠিক ঐ সময় গত রাতের ঘটনার কথা স্মরণ হয়। আমি লজ্জিত হই । নিজেকে খুব অপরাধী বলে মনে হয় যে রোগাক্রান্ত মানুষের কথা ভুলে আমি শয্যাত্যাগে বিলম্ব করি, বিরক্তও হই। কেন আমি বিরক্ত হলাম এবং কেনই বা —-আমার উঠতে দেরি হবে- আমি তো মানুষের সেবা করার জন্য চিকিৎসার মতো গুরুদায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছি পীড়িত মানুষের প্রয়োজনে যদি না এগিয়ে গেলাম আমি কেমন মানুষ? কেমন ডাক্তার?
চিত্তের এই ক্ষুদ্রতা আমি আজও অতিক্রম করতে পারিনি। রোগীর সেবার চেয়ে শীতের উষ্ণতাকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলাম — এই বিষয়টিতে আমার খুব বিবেক দংশন হয়েছিল। মনে হয়েছিল লোকে আমাকে যত বড় ডাক্তারই বলুক না কেন এবং আমার চেম্বারে রোগীর যত বড় লাইনই পড়ুক না কেন আসলে আমি –ডাক্তার হাসান মির্জা, আজও সত্তিকারের ডাক্তার হয়ে উঠতে পারিনি। মনে হয়েছিল আমি স্বার্থপর, ডাক্তার হওয়ার যোগ্য লোক আমি নই। হোমিওপ্যাথির মত চিকিৎসা জগতের বাসিন্দা হয়েও এই রকমের স্বার্থপরতা, রোগীর প্রতি অনীহা তো কাম্য নয়।
যাইহোক একটু বেলা হতে প্রতিবেশী বন্ধুটিকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলাম
বাচ্চাটি কেমন আছে?
বললেন, ভালো আছে, কাশি আর হয় নি,
বাচচাটি এখন কোথায়? জানতে চাইলাম।
সে এখনো ঘুমোচ্ছে— বলে প্রতিবেশী বন্ধুটিি যেতে উদ্যত হল ।
বললাম, চা খেয়ে যাও,
অনিচছা সত্তেও চা-বিস্কুট খেয়ে সে বিদায় নিল।
আসলে গত রাতের অডাক্তার সুলভ মানসিকতার জন্য উক্ত প্রতিবেশীর কাছে নিজেকে আড়াল করতে তাকে চা-বিস্কুটের আপ্যায়ন করেছিলাম। অন্যের মনোতুষ্টি আর কি।
বস্তুত এটাও এক ধরনের চারিত্রিক সীমাবদ্ধতা। সেদিনকার সেই ঘটনা যে আমার চারিত্রিক সীমাবদ্ধতাকে প্রকট করে দিয়েছিল তার জন্য এই এতগুলি বছর পর এই অশীতিপর বৃদ্ধকে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে। আমি মনে করি একজন চিকিৎসককে এইরকম সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে উঠতে হবে। ক্ষুদ্র চিত্ততা মানুষের বড় হওয়ার পথে যে কত বড় বাধা সেই শিক্ষা নিতে আমি অনেক বিলম্ব করে ফেলেছি।
এই অবেলায় আপনাদের নিজের জীবনকথা একটু-আধটু শুনিয়ে রাখছি এই কারণে যে, জীবনকে গড়তে হলে, বড় হতে গেলে নিজের ভিতরকার মানুষকে আগে গড়ে তোলার পাঠ নিতে হবে। তুলাদন্ডে মেপে দেখে নেওয়া উচিত নিজের ক্ষুদ্রতাকে, নিজের সীমাবদ্ধতাকে। ———-
অন্যের অধিকারহরণ কি পাপ নয়? অহমবোধ কি চিত্তহীনতার পরিচয় দেয় না?
আমরা চায়ের টেবিলের আড্ডায় নিজেদেরকে সবজান্তা হিসেবে জাহির করতে ত্রুটি রাখিনা, অন্যের সমালোচনা করে তার মুন্ডুপাতে বিলম্ব করি না । অথচ নিজেকে কখনো আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করি না আমি আজও মানুষ হতে পেরেছি কি?
প্রচলিত রাজনীতির কারবারীদের মতো আমরা ডাক্তাররা যেভাবে নিজেদেরকে মুখোসে ঢেকে নিয়েছি তাতে আর যাই হোক মানবকল্যাণ করা যায় না “।

হাসান সাহেবের অমূল্য বাণী——
★ মেটিরিয়া মেডিকা পাঠ করার একটা বিশেষ দিক হল এই যে, পাঠক অবশ্যই প্রতিটি ঔষধের চরিত্র পাঠ করার সঙ্গে সদৃশ ঔষধের তুলনামূলক গুনাগুন ও তাদের মধ্যকার সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম পার্থক্যটিও গভীরভাবে অধ্যায়ন করবেন। নচেৎ মেটিরিয়া মেডিকা পাঠ অর্থহীন হবে এবং চিকিৎসক হিসাবে ব্যর্থদের তালিকায় তার ঠাঁই হবে। সাজানো-গোছানো ঝকঝকে-তকতকে চেম্বারে বসে রোগীর অপেক্ষায় হাপিত্যেশ করা ছাড়া গত্যন্তর থাকবে না। সুতরাং হোমিওপ্যাথিক মেটিরিয়া মেডিকা তুলনামূলক পাঠের সাহায্যে হৃদয়ঙ্গম করতে হবে।
★ হোমিওপ্যাথির সূক্ষতা, হোমিওপ্যাথির গভীরতা, হোমিওপ্যাথির অভিনবত্ব এখানেই যে সে মানবের অন্তরজাত ইচ্ছা-অনিচ্ছা ও তাদের অভিব্যক্তি প্রকাশ করে দেয় ।
আসলে মানবের অন্তরজাত ইচ্ছাটি এমনই যে তা কোনভাবেই গোপন থাকে না। তার প্রকাশ অবশ্যম্ভাবী। ক্রোধ, জেদ, বদমেজাজের কারণে প্রকাশ্যে পায়ে পা তুলে কলহ করার প্রবৃত্তি আমাদেরকে অনেক ঔষধ এক নজরে চিনিয়ে দেয়,
★ জগতে যদি সত্যিকারের ধর্ম বলে কিছু থেকে থাকে তা হল স্রষ্টার সেরা সৃষ্টি মানবের কল্যাণ। একজন সূক্ষদর্শী হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার যিনি হোমিওপ্যাথির দর্শনতত্ত্বে পন্ডিত, অর্গাননের যথার্থ অনুসারী, সদৃশবিধান যার কাছে সাধনার ধন, এবং সর্বোপরি যিনি মনুষ্য জাতির কল্যাণ চিন্তাকামী তিনি যে প্রকৃত অর্থে যথার্থ ধার্মিক তা আমি নিশ্চয় করে বলতে পারি। স্রষ্টার সৃষ্টিকে স্বীকার করে তার আজ্ঞা মেনে তার সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা, গবেষণা ও বাস্তবায়নই হল সত্যিকারের ধর্ম।
★ হ্যানিম্যান, যিনি মনুষ্য জাতির কল্যাণ চিন্তায় চির জীর্ণবাসে নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন এবং সর্বোপরি যিনি নিজেকে পুরোপুরি ভাবে স্রষ্টার কাছে সমর্পন করেছিলেন, তিনি বলেন একজন সদৃশ বিধানের অনুসারী হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার অবশ্যই একজন সাধারন ধর্মযাজকের ন্যায় জীবন যাপন করবেন।
★ আমারই কিছু ছাত্র আমি খুব ভাল করে জানি –তারা জীবনে কোনদিন কেন্ট পড়েনি, ফ্যারিংটন পড়েনি, বোরিক পড়েনি, ডানহাম পড়েনি, লিপি, বোনিংহোসেনের খবর পর্যন্ত রাখেনি , এমনকি মহামতি হ্যানিম্যানের সঠিক পরিচয় বা তার অর্গাননের সঠিক পাঠও নেয়নি।
এ কেমন ধরনের মানসিকতা?
চিকিৎসার নামে এই ধরনের প্রতারণা হোমিওপ্যাথির সর্বনাশ ডেকে আনছে৷ ঠক, জোচ্চোর প্রতারকদের জন্য হোমিওপ্যাথি অন্ততঃ নয় ।
★ গুরুমশাই মতিলাল মুখার্জির সাত্ত্বিক জীবন , নির্লোভ চিত্ত, মানব কল্যাণের জন্য তার গগনবিস্তৃত হৃদয় দিয়ে হোমিওপ্যাথিকে যে মর্যাদা তিনি দিয়ে গেছেন তেমনি হতে হবে আমাদের। নইলে বিধাতার রুদ্ররোষে জ্বলে-পুড়ে ছাই হতে সময় লাগবে না। শয়তানি হরকত কখনো মানবের কল্যাণ করতে পারে না।
★ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক হিসাবে আমরা যদি শয়তানি কর্ম থেকে নিজেদের মুক্ত রাখতে পারি তাহলে জয়মাল্য আপনা থেকেই ভূষিত হবে।
★ কলহ বিবাদ যারা করে তারা ভাল মানুষ নয়। এই সব লোকেরা আল্লাহ ও তার রসুলের ভালবাসা থেকে বঞ্চিত হয়।
★ ক্রোধ সংবরন করবে, কারন ক্রোধ তোমার জীবনের সর্বনাশ ঘটাতে পারে।
★ মনই মানুষের প্রকৃত সত্তা। এই মনের গুণেই মানুষ কখনও অতি মানব, মহামানবে পরিণত হন, আবার কখনও সে নরপিশাচ বা নরশয়তান রূপে আত্মপ্রকাশ করেন। বাইরের আবরণ , বাইরের সাজসজ্জা, বাইরের চাকচিক্য দিয়ে তাই তার ভিতরের মানুষটাকে চেনা যায় না ।
★ শালীনতা, আত্মমর্যাদাবোধ, বিবেকবোধ, আত্মম্ভরিতা , হঠকারিতা, পৈশাচিকতা, ইত্যাদি ভিতরের জিনিস। ভিতরের এই সত্ত্বা যখন বাহির হয়ে পড়ে তখনই চেনা যায় মানুষের আসল রূপ৷